রবিবার, 18 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ব্রিটেনের রাণী, ইতালির মেলোনি, তুরস্কের সুন্দরী—কী চায় উগান্ডার রাষ্ট্রনায়কেরা?

এসব শাসকদের অনেকেই ব্রিটেনের রাণী, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং তুরস্কের সবচেয়ে সুন্দরী নারীকেও বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। যদিও দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তনের সাথে সাথে বারবার পরিবর্তিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় আদর্শ, তবুও রাষ্ট্রনায়কদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। ভাগ্য বদলায়নি উগান্ডার জনগণের। বিমান ছিনতাই করে ইসরায়েলি নাগরিকদের জিম্মি বানিয়ে যখন ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন উগান্ডায় অবতরণ করে, দেশটির তৎকালীন সামরিক শাসক ইদি আমিন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা প্রদান করে ফিলিস্তিনি হাই

ব্রিটেনের রাণী, ইতালির মেলোনি, তুরস্কের সুন্দরী—কী চায় উগান্ডার রাষ্ট্রনায়কেরা?

উগান্ডার রাজনৈতিক ইতিহাস যেমন রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর চড়াই-উতরাইয়ে ভরা, তেমনি কিছু শাসকের বিচিত্র স্বভাব, উদ্ভট দাবি এবং রসিকতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত। বিশেষ করে ইদি আমিন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী সামরিক ব্যক্তিদের কিছু কাণ্ডকারখানা মাঝেমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়।

এসব শাসকদের অনেকেই ব্রিটেনের রাণী, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং তুরস্কের সবচেয়ে সুন্দরী নারীকেও বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। যদিও দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তনের সাথে সাথে বারবার পরিবর্তিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় আদর্শ, তবুও রাষ্ট্রনায়কদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। ভাগ্য বদলায়নি উগান্ডার জনগণের। বিমান ছিনতাই করে ইসরায়েলি নাগরিকদের জিম্মি বানিয়ে যখন ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন উগান্ডায় অবতরণ করে, দেশটির তৎকালীন সামরিক শাসক ইদি আমিন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা প্রদান করে ফিলিস্তিনি হাইজ্যাকারদের। কিন্তু চলমান ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে  তার সামরিক উত্তরসূরি, বর্তমান রাষ্ট্রপতির পুত্র ও সেনাপ্রধান মুহুজি কাইনেরুগাবা ইসরায়েলের পক্ষ অবলম্বন করে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে।

নিচে উগান্ডার রাষ্ট্রনায়কদের সবচেয়ে আলোচিত ও বিচিত্র কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলো:

ইদি আমিন: 'স্কটল্যান্ডের শেষ রাজা' ও বিচিত্র উপাধি

উগান্ডার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং অদ্ভুত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন ইদি আমিন। তার কর্মকাণ্ডে ভয়াবহতা এবং হাস্যরসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিল। এমনকি তিনি কয়েকজন ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গকে ব্যক্তিগত ভৃত্য হিসেবে নিয়োগ দেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কোট-স্যুট পড়া এই শ্বেতাঙ্গরা কাধের উপর পালকি রেখে তাকে বহন করতো। এই ঘটনা ছিল ইউরোপীয়দের প্রতি ইদি আমিনের ঘৃণার প্রকাশ।

উপাধির বহর: তিনি নিজেকে এমন সব উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন যা শুনলে অবাক হতে হয়। তার পূর্ণ উপাধি ছিল— "মহামান্য আজীবন প্রেসিডেন্ট, ফিল্ড মার্শাল আলহাজ্ব ডক্টর ইদি আমিন দাদা, ভি.সি., ডি.এস.ও., এম.সি., পৃথিবীর সমস্ত পশু ও সমুদ্রের মাছের অধিপতি এবং আফ্রিকায় বিশেষ করে উগান্ডায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিজেতা।"

ব্রিটিশ রানিকে প্রেমপত্র: ইদি আমিন ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথকে একাধিকবার অদ্ভুত সব চিঠি লিখেছিলেন। একবার তিনি রানিকে লিখেছিলেন, তিনি যদি প্রকৃত পুরুষ দেখতে চান তবে যেন উগান্ডা সফর করেন। এমনকি তিনি নিজেকে স্কটল্যান্ডের রাজা হিসেবেও দাবি করতেন।

স্বেচ্ছায় রক্তদান ও অদ্ভুত দাবি: তিনি দাবি করতেন তার শরীরে এমন এক বিশেষ শক্তি আছে যা দিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান।

মুহুজি কাইনেরুগাবা: টুইট-ডিপ্লোম্যাসি ও বিয়ের প্রস্তাব 

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইওভেরি মুসেভেনির ছেলে এবং উগান্ডার বর্তমান সেনাপ্রধান (সিডিএফ) মুহুজি কাইনেরুগাবা তার টুইটার (বর্তমানে X) বার্তার জন্য অত্যন্ত বিতর্কিত। তিনি প্রায়ই এমন সব মন্তব্য করেন যা আন্তর্জাতিক মহলে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

জর্জিয়া মেলোনিকে বিয়ের প্রস্তাব: ২০২২ সালে মুহুজি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে উদ্দেশ্য করে এক অদ্ভুত টুইট করেন। তিনি প্রস্তাব দেন যে, মেলোনিকে বিয়ে করার বিনিময়ে তিনি উপহারস্বরূপ ১০০টি উন্নত জাতের 'আনকোলে' গরু দিতে চান। তিনি আরও বলেছিলেন, যদি মেলোনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তবে তিনি রোম আক্রমণ করবেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে তার বাবা প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।

তুরস্কের সুন্দরী স্ত্রী দাবি: মুহুজি বিভিন্ন সময় তার ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সরব থাকেন। তিনি একবার দাবি করেছিলেন যে, তুর্কি নারীরা বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর এবং তার একজন তুর্কি সুন্দরী স্ত্রী প্রয়োজন। তার এই ধরনের অবাস্তব এবং প্রকাশ্য ব্যক্তিগত ফ্যান্টাসি প্রায়ই উগান্ডার সামরিক প্রটোকলকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

কেনিয়া দখলের হুমকি: এক টুইটে তিনি দাবি করেছিলেন যে, তার সেনাবাহিনী কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি দখল করতে মাত্র দুই সপ্তাহ সময় নেবে। এই মন্তব্যের কারণে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল।

ইওভেরি মুসেভেনি: দীর্ঘকালীন শাসন ও 'পারিবারিক' রাজনীতি

বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি নিজেও মাঝেমধ্যে বিচিত্র কারণে খবরে আসেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এই নেতা নিজেকে আধুনিক উগান্ডার নির্মাতা দাবি করলেও তার কিছু আচরণ বেশ অদ্ভুত:

রাস্তার পাশে অফিস: একবার তাকে মহাসড়কের পাশে চেয়ার-টেবিল পেতে বসে অফিশিয়াল ফোন কল করতে দেখা গিয়েছিল, যা সামাজিক মাধ্যমে হাসির খোরাক জোগায়।

করোনাভীতি: কোভিড-১৯ চলাকালীন তিনি জনগণের সামনে এমনভাবে ব্যায়াম করে দেখিয়েছিলেন যাতে প্রমাণ করা যায় যে ঘরে বসেই ফিট থাকা সম্ভব। যদিও তার কঠোর শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা রয়েছে।

জোসেফ কোনি: আধ্যাত্মিক যোদ্ধা ও লর্ড'স রেজিস্ট্যান্স আর্মি

রাজনৈতিক শাসক না হলেও উগান্ডার ইতিহাসের এক বিশাল অংশ জুড়ে আছেন বিদ্রোহী নেতা জোসেফ কোনি। তার কর্মকাণ্ড ছিল চরম পর্যায়ের উদ্ভট ও নৃশংস। তিনি দাবি করতেন যে তার ওপর 'পবিত্র আত্মা' ভর করে এবং তিনি ঈশ্বরের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারেন। তার যোদ্ধাদের তিনি শিখিয়েছিলেন যে, শরীরে এক বিশেষ তেলের প্রলেপ মাখলে শত্রুর গুলি তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। এই অন্ধবিশ্বাসের কারণে হাজার হাজার শিশু সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল।

উগান্ডার এই শাসকদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের অনেকেই ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করতেন। ইদি আমিনের উপাধি প্রীতি থেকে শুরু করে মুহুজির আধুনিক 'টুইটার আসক্তি'—সবই উগান্ডার রাজনীতিকে বিশ্বের কাছে রহস্যময় এবং কখনো কখনো হাস্যকর করে তুলেছে। তবে এই অদ্ভুত আচরণের আড়ালে উগান্ডার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক শোষণ ও সংগ্রামের ইতিহাসও মিশে আছে।