যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলপন্থি বিভিন্ন সংগঠনের লবিং ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি গণ-তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
এই বিষয়ে দেশটির আইনসভা বা পার্লামেন্টে একটি বিশেষ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মূলত ১ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি ব্রিটিশ নাগরিকের সই করা একটি অনলাইন আবেদনের প্রেক্ষিতেই এই বিতর্কের আয়োজন করা হতে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, যেকোনো অনলাইন পিটিশনে যদি ১ লাখের বেশি নাগরিক সমর্থন জানান, তবে তা পার্লামেন্টে আলোচনার টেবিলে তোলা বাধ্যতামূলক।
আবেদনকারী নাগরিকদের অভিযোগ, গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান চরম সংকটের মধ্যেও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব এজেন্ডা এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো পর্দার আড়াল থেকে অনৈতিকভাবে কাজ করছে। তবে ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতাসীন লেবার সরকার এই তদন্তের দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে। সরকারের দাবি, রাজনৈতিক লবিংয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য দেশে ইতিমধ্যে যথেষ্ট শক্তিশালী ও কার্যকর আইনি কাঠামো বলবৎ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল এবং লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েলের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু লবিং গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এই সংগঠনগুলোর মূল কাজ হলো ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় রাখা। এর বাইরে খোদ ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যদের ইসরায়েল ভ্রমণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে থাকে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় উঠে এসেছে যে, লেবার পার্টির বর্তমান ও সাবেক নীতি-নির্ধারকদের পেছনে এই লবিং গ্রুপগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলেছে। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যও ইসরায়েল সফরের জন্য লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান গ্রহণ করেছেন।
শুধু অর্থায়নই নয়, তেল আবিবের নীতি ও আগ্রাসনের সমালোচনা করা ব্রিটিশ রাজনীতিকদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে বা তাদের দল থেকে কোণঠাসা করে ফেলতেও এই গ্রুপগুলো কলকাঠি নাড়ে বলে বিভিন্ন তথ্যচিত্রে প্রমাণ মিলেছে। অতীতে ইসরায়েলের অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় অনেক নামী রাজনীতিককে সুকৌশলে ইহুদি-বিদ্বেষের তকমা দিয়ে দল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বা সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে, যার অন্যতম বড় উদাহরণ লেবার পার্টির সাবেক শীর্ষ নেতা জেরেমি করবিন।
সমালোচকদের মতে, এই লবিংয়ের গভীর প্রভাব ব্রিটেনের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। লেবার সরকার গত বছর ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও গাজায় চালানো ভয়াবহ সামরিক অভিযানকে 'গণহত্যা' হিসেবে মেনে নিতে এখনো অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। পাশাপাশি ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসির বিরুদ্ধেও গাজা যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে ইসরায়েলের প্রতি নগ্ন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। খোদ বিবিসির শতাধিক সংবাদকর্মী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের এই দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এই লবিংয়ের প্রভাব নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নেতৃত্ব তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগবে। কারণ এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা ওয়াশিংটনের সুনজরে পড়বে না এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের তীব্র ক্ষোভের পাশাপাশি নতুন করে ইহুদি-বিদ্বেষের বিতর্ক উস্কে দেবে। ফলে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ইস্যুটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য এক জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।