গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও হত্যাযজ্ঞের তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণা এলেও উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি হামলা ও ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি থামেনি। এমন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
গাজার প্রতি ৩০ জনে নিহত একজন
টানা তিন বছরের ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু। যুদ্ধ শুরুর আগের জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, গাজার প্রতি ৩০ জন মানুষের মধ্যে একজন ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে হাসপাতাল ও সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত মৃত্যুগুলোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা এবং নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ এখনো এই হিসাবের বাইরে রয়েছেন।
গাজার মানবিক বিপর্যয় শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। অর্থাৎ উপত্যকার প্রতি ১৩ জনের মধ্যে একজন হামলায় আহত হয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আহতদের প্রায় ২৪ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। এদের এক-চতুর্থাংশ শিশু।
ইসরায়েলি হামলার পরও গাজায় যে অল্প কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র সচল রয়েছে, সেগুলো বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটের মধ্যেই এসব কেন্দ্রকে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বারবার লঙ্ঘিত যুদ্ধবিরতি
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গত ৩৬১ দিনের মধ্যে ৩২৫ দিনই গাজায় ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৩৬ দিনে হামলা, প্রাণহানি বা আহত হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এরপরও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে, গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর রয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর দুপুরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৪৬০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫ হাজার ১১৬ জন।
ধ্বংস হয়েছে ৯৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র
গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রই ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের যুদ্ধের পর গাজার ৯৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অসংখ্য রোগী।
যুদ্ধের আগে গাজায় ৬৬৬টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ৪২টি চালু রয়েছে।
চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, হাসপাতালে হামলা চালানো নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে হাসপাতালে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পানির জন্য হাহাকার
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল গাজার দুর্বল পানি অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। কূপ, পাইপলাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বহু পাইপলাইন ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক পানির কূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। কিছু কূপ আবার পয়ঃবর্জ্যের কারণে দূষিত হয়েছে।
বর্তমানে গাজার প্রায় অর্ধেক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ছয় লিটারেরও কম পানি পাচ্ছেন। এই সামান্য পানি দিয়েই তাদের পান করা ও রান্নার প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। অথচ জরুরি পরিস্থিতিতে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম ২০ লিটার পানি প্রয়োজন।
ধ্বংস হয়েছে ৯৩ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যবর্তী প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজা উপত্যকায় ধ্বংসযজ্ঞ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। উপত্যকার মোট স্থাপনার ৮২ শতাংশই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য বলছে, পুরো এলাকা ও একাধিক মহল্লা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এর ফলে ১৯ লাখ ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ।
যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষাব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকার ৯৩ শতাংশ স্কুল নতুন করে নির্মাণ করতে হবে।
এর ফলে ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ ছাড়া গাজায় অন্তত ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ধ্বংস হয়েছে। যেসব ভবন এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকগুলো বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাংবাদিকদের জন্যও মৃত্যুপুরী গাজা
শিরিন আবু আকলেহ অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় প্রায় ৩০০ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আল জাজিরার ১২ জন সাংবাদিক রয়েছেন।
ইসরায়েল গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে। তবে অল্প কয়েকজন সাংবাদিককে ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে উপত্যকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই তাদের কাজ করতে হচ্ছে।
৭ অক্টোবরের হামলা থেকে তিন বছরের যুদ্ধ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সশস্ত্র শাখা ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালায়। ওই হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন। একই সময়ে হামাস প্রায় ২৪০ জনকে জিম্মি করে।
ইসরায়েলিরা যখন ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনা স্মরণ করছে, তখন ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ১ লাখ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
এর মধ্যে গাজা উপত্যকায় ৬৫ হাজার হামলা হয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের প্রতিবেশী লেবানন ও সিরিয়ায় ২৮ হাজার, ইরানে ৪ হাজার ৫০০ এবং ইয়েমেনে ৮০টি হামলা চালানো হয়েছে।