রাজধানীতে রাত নামে, কর্মব্যস্ত মানুষের ভিড় কমে যায়। ফাঁকা হয় নগরীর রাস্তাঘাট ধিরে ধিরে। অভিজাত পাড়া হিসবে পরিচিত গুলশান-বনানীর মতো এলাকায় তখন অন্য চিত্র। দামি গাড়িতে করে বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেল- রেস্টুরেন্টে-লাউঞ্চের সামনে নামতে থাকে একেকজন তরুণ-তরুণী। এসব ঝাঁ-চকচকে ক্যাফে ও লাউঞ্জগুলোর আড়ালে গড়ে উঠেছে এক নিষিদ্ধ সংস্কৃতি—‘সিসা লাউঞ্জ’। বাইরে থেকে সাধারণ রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে মনে হলেও, ভেতরে চলছে ভিন্ন দৃশ্য—যেখানে আভিজাত্যের আড়ালে গড়ে উঠেছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, অপরাধ ও মাদকের বিশাল এক চক্র।
সিসা লাউঞ্জ কী?
‘সিসা’ বা ‘হুক্কা’ মূলত তামাকজাত ধোঁয়া টানার একটি যন্ত্র, যা পানির মাধ্যমে ফিল্টার করে গ্রহণ করা হয়। আধুনিক শহুরে সংস্কৃতিতে এটি ‘শিশা লাউঞ্জ’ বা ‘হুক্কা বার’ নামে পরিচিত স্থানে পরিবেশন করা হয়, যেখানে বসে আড্ডা, গান-বাজনা ও ধূমপানের পরিবেশ তৈরি করা হয়। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য কোনো বৈধ অনুমোদন নেই।
যেসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এসব লাউঞ্জে রাতে গোপন আড্ডা বসে, যেখানে তামাকের সঙ্গে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল এমনকি তরল কোকেন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কিছু স্থানে সাউন্ডপ্রুফ আলাদা কেবিন তৈরি করা হয়, যা নির্দিষ্ট গ্রাহকদের জন্য ঘণ্টাভিত্তিক ভাড়া দেওয়া হয়। এসব কক্ষে মাদক সরবরাহের পাশাপাশি যৌন কার্যক্রমসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এসব লাউঞ্জের নিয়মিত গ্রাহক
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, এসব স্থানে মূলত তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায় এবং অন্তত ৫০টির মতো লাউঞ্জ নিয়মিত তাদের আড্ডাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দের সংগীত, ধোঁয়া ও অ্যালকোহলের গন্ধে এসব জায়গা সক্রিয় থাকে বলে জানা যায়।
হাইকোর্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও যেভাবে চলছে ভোগ-বাণিজ্য
বাংলাদেশে সিসা বা হুক্কা ব্যবহারের জন্য কোনো আইনি অনুমোদন নেই এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ ধরনের ব্যবসার লাইসেন্স দেয় না। এছাড়া ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধ, যা এসব লাউঞ্জে লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে হাইকোর্ট গুলশান ও বনানীসহ রাজধানীতে অবৈধ সিসা লাউঞ্জ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। আদালত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য সংস্থাকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলে। একইসঙ্গে সারা দেশে অবৈধ হুক্কা লাউঞ্জ ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশও দেওয়া হয়।
আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এসব লাউঞ্জ বন্ধ হয়নি মূলত দুর্বল নজরদারি ও প্রয়োগের ঘাটতির কারণে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন কার্যকর মনিটরিং না থাকায় এই ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টের আড়ালে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের অভিযানে ছিল বাধা
অতীতে কিছু অভিযানে লাউঞ্জ বন্ধ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো নাম পরিবর্তন করে পুনরায় চালু হয়েছে—যা আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ও প্রভাবশালী মহলের সম্ভাব্য আশ্রয়ের প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনায় অনানুষ্ঠানিক চাপ বা প্রভাবের কারণে নিয়মিত তদারকি ব্যাহত হয়েছে—যদিও এ বিষয়ে সরকারি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা সীমিত।
গুলশান-বনানীর 'সিসা লাউঞ্জ সংস্কৃতি' জনস্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক মূল্যবোধ, বিকৃত সাংস্কৃতিক চর্চা এবং তারুণ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে এখনও লাউঞ্জগুলোর কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।