সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ইরান পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের স্থায়ী অবসান এবং একটি সুদূরপ্রসারী পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত হলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের অনুমতি দিতে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

ইরান পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
ছবি : সংগৃহীত
তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের স্থায়ী অবসান এবং একটি সুদূরপ্রসারী পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত হলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের অনুমতি দিতে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন প্রশাসন। একই সঙ্গে এই সমঝোতার অগ্রগতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টিকেও আলোচনার টেবিলে রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি ‘দেশ পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বড় একটি তহবিল’ গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছে। তবে এই সমস্ত অর্থনৈতিক সুবিধা এবং বিশাল অঙ্কের তহবিল প্রাপ্তি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে ইরান কতখানি সফলভাবে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের (MoU) শর্তাবলি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে পারছে, তার ওপর।

আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা থাকলেও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, গত রবিবারই ‘ইলেকট্রনিক্যালি’ বা ডিজিটাল মাধ্যমে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই পুনর্গঠন তহবিলটি তখনই পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে, যখন সমঝোতা স্মারকের শর্তানুযায়ী একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান অর্জিত হবে। এর পূর্বশর্ত হিসেবে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বৃদ্ধি করা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরাসরি দেওয়া হবে না। মূলত ইরানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বিশ্বের বড় বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য একটি নিরাপদ ও সমন্বিত বিনিয়োগ কাঠামো হিসেবে এই তহবিলটি গড়ে তোলা হবে।

প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যার বিশাল এবং প্রাকৃতিক জ্বালানিসম্পদে সমৃদ্ধ ইরানকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে বৈশ্বিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। আলোচনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপের বহু নামী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সেখানে বিনিয়োগের ব্যাপারে তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া এশিয়ার পরাশক্তি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শক্তিশালী কোম্পানি এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বড় প্রতিষ্ঠানও এই তালিকায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে এই বিনিয়োগ তহবিলের আকার আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আর্থিক প্রস্তাবটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণে জড়াতে চান না, যেখানে তার বিরুদ্ধে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে পুরস্কৃত করার বা আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কারণ অতীতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির কড়া সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। তখন তার মূল অভিযোগই ছিল যে, ওই চুক্তির মাধ্যমে তেহরানকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও অন্যায্য সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

চলমান সমঝোতার বিরোধিতাকারীরা দাবি করছেন, এবারের আলোচনায় থাকা আর্থিক সুবিধার পরিমাণ ওবামা আমলের চেয়েও অনেক বড়। তবে উদ্ভূত বিতর্কের জবাবে ওয়াশিংটনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন, জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ডিজিটাল মাধ্যমে নথিতে স্বাক্ষর করলেও এখন পর্যন্ত ইরানে কোনো মার্কিন অর্থ প্রবাহিত হয়নি। আটক থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পুরো প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত ধীরগতির এবং তা সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক আলোচনার চূড়ান্ত সফলতার ওপর ঝুলে থাকবে।

অবশ্য পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা শুরুতে ইরানকে সীমিত কিছু আর্থিক ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যবহারের অনুমতি কোনো নির্দিষ্ট সূচক বা একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হবে না, বরং দেশটির সামগ্রিক আন্তর্জাতিক আচরণ ও গতিবিধি মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তেহরান ও ওয়াশিংটন তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে একমত হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম শর্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সমস্ত ইউরেনিয়াম ইরানের অভ্যন্তরেই পাতলা বা ডাইলিউট করে কার্যকারিতাহীন করে ফেলা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, ইসরায়েলের সঙ্গে গত জুনে হওয়া ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রধান তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় নিখুঁত হামলা চালিয়ে তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফলে ওয়াশিংটনের বর্তমান মূল লক্ষ্যই হলো এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে এমন একটি কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে ইরান ভবিষ্যতে আর কখনোই তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা নতুন করে গড়ে তুলতে না পারে।