মধ্যপ্রাচ্যের দুই শক্তিশালী দেশ তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গাজা ইস্যু থেকে শুরু করে আঞ্চলিক আধিপত্য—নানা কারণে আঙ্কারা ও তেল আবিবের মধ্যে চলছে তীব্র ‘বাকযুদ্ধ’।
সম্প্রতি তুরস্কের ইস্তাম্বুল প্রসিকিউটর অফিস থেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ‘সুমুদ ফ্লোটিলা’ হামলার অভিযোগে চার্জশিট দাখিলের পর এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, কেবল মৌখিক আক্রমণ নাকি তুরস্কের হাতে ইসরায়েলকে কাবু করার মতো কার্যকর কোনো কৌশলগত হাতিয়ার বা ‘লিভার’ রয়েছে?
জ্বালানি তেলের ‘ভালভ’ কি বন্ধ হবে?
তুরস্কের হাতে থাকা অন্যতম বড় তুরুপের তাস হলো আজারবাইজানের তেল। ইসরায়েলের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ মেটায় আজারবাইজান, যা ‘বাকু-তিবলিসি-জেহান’ (BTC) পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্কের ভূখণ্ড হয়ে সরবরাহ করা হয়। তুরস্ক যদি এই পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ করে দেয়, তবে ইসরায়েল সাময়িকভাবে জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।
বর্তমানে ইসরায়েলের ওপর কোনো আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে তারা উন্মুক্ত বাজার থেকে তেল কিনতে পারবে। এছাড়া আজারবাইজানের সাথে তুরস্কের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে আঙ্কারা চাইলেই একতরফাভাবে এই পাইপলাইন বন্ধ করতে দ্বিধায় পড়তে পারে।
আকাশপথ বন্ধের হুমকি
আরেকটি আলোচিত পদক্ষেপ হতে পারে ইসরায়েলি বেসামরিক বিমানের জন্য তুরস্কের আকাশপথ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা। এটি কার্যকর হলে ইসরায়েলি বিমান সংস্থাগুলোর খরচ এক লাফে বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে রাশিয়া বা আজারবাইজানে যাওয়ার রুট দীর্ঘ হবে, যার ফলে জ্বালানি খরচ এবং টিকিটের দাম বাড়বে। তবে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলোর আকাশপথ ইসরায়েলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় তুরস্কের এই অবরোধের কৌশলগত প্রভাব আগের চেয়ে অনেকটাই কমে গেছে।
বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক
তুরস্ক ইতোমধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাস থেকে ইসরায়েলের সাথে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ এখনও চলছে, তবে আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘জিরো ট্রেড’ বা শূন্য বাণিজ্য হিসেবে দাবি করে।
উত্তপ্ত পরিবেশ ও নেতাদের বক্তব্য
বাকযুদ্ধের তীব্রতা বোঝা যায় দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে তুরস্কও বসে নেই।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, "ইসরায়েল শত্রু ছাড়া বাঁচতে পারে না এবং এখন তারা তুরস্ককে সেই ভূমিকায় রাখার চেষ্টা করছে।"
অন্যদিকে, আঙ্কারার প্রেসিডেন্সিয়াল কমিউনিকেশন ডিরেক্টরেট থেকে সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর একটি প্রতিবেদনের নিন্দা করে জানানো হয়েছে, "প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইসরায়েল আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য প্রচার করা হচ্ছে।"
তুরস্ক ও ইসরায়েলের এই বিরোধ কি কেবলই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কৌশল নাকি বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরদোয়ান তার দেশে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমর্থন বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুও তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পয়েন্ট স্কোর করতে তুরস্ককে পাল্টা আক্রমণ করছেন। তবে সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়ে বর্তমানে দুই দেশই একে অপরকে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার কৌশলকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই