সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

খেলাপির টাকা ব্যাংকে ফেরাতে সুদ মওকুফ, কারা পাচ্ছেন এই সুবিধা?

দেশের ব্যাংকিং খাতে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ দ্রুত ব্যাংকে ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খেলাপির টাকা ব্যাংকে ফেরাতে সুদ মওকুফ, কারা পাচ্ছেন এই সুবিধা?
ছবি : সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ দ্রুত ব্যাংকে ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের খেলাপি ঋণের মূল অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করবেন, তাদের কোনো সুদ দিতে হবে না। অর্থাৎ, ঋণের বিপরীতে আগে যে নির্দিষ্ট হারে সুদ হিসাব করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি মওকুফ করা হবে। এই বিশেষ এক্সিট সুবিধা গ্রহণ করতে হলে ঋণগ্রহীতাদের আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ বকেয়া অর্থ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে দেশের সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা আগের তিন মাসের তুলনায় ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকার ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সাধারণত খেলাপি, অবলোপন এবং পুনঃতফসিল করা ঋণসমূহকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

‘অনাদায়ী ঋণ আদায় বা সমন্বয়ে বিশেষ এক্সিট সংক্রান্ত নীতিমালা’ শীর্ষক সার্কুলারে বলা হয়েছে, দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেসব ঋণগ্রহীতা বিভিন্ন সংকটের কারণে খেলাপি হলেও ব্যবসা পরিচালনা এবং ঋণ পরিশোধে আন্তরিক, তাদের এই এককালীন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেমন কমবে, তেমনি ব্যাংকের নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

নতুন এই নীতিমালার আওতায় ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণসমূহকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ এক্সিট সুবিধা দেওয়া যাবে। এই সুবিধা কার্যকরের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ঋণগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ বকেয়া দায় এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহকদের আরোপিত ও অনারোপিত সব ধরনের সুদ মওকুফ করা যাবে এবং এর ফলে তহবিল খরচ আদায়ের পূর্ববর্তী বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। এছাড়া ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে পুনঃতফসিল করা মন্দ ঋণগুলোও এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবে। এই বিশেষ এক্সিট সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও স্মল ঋণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এই নির্দেশনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে এই বিশেষ সুযোগের ফলে সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংক তাদের আটকে থাকা খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ আদায় করতে পারবে। সংগৃহীত এই অর্থ পরবর্তীতে নতুন গ্রাহকদের মাঝে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সম্ভব হবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করবে।