বিশ্ব রাজনীতির তুখোড় এক খেলোয়ার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে তার অন্যতম প্রধান ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি হলেও ক্রেমলিন কার্যত নিশ্চুপ। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় রাশিয়ার এই নীরবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ থেকে নিজের স্বার্থ এবং অর্জনের সম্ভাব্য সব সুযোগ খুঁজে দেখছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তেমনি তাঁর ভেতরে কাজ করছে গভীর আশঙ্কাও—পরবর্তী লক্ষ্য তিনি নিজেও হতে পারেন।
ভাইরাল মিমে পুতিনকে বিদ্রূপ
সম্প্রতি রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে পুতিনের বহুল উদ্ধৃত একটি বক্তব্য- “আমরা নিজেদের বন্ধুদের ছেড়ে যাই না” লেখা পোস্টারে জুড়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর সঙ্গে তোলা কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান মিত্রের ছবি, যাঁদের একসময় মস্কোর “কৌশলগত মিত্র” বলে ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

এই তালিকায় রয়েছেন—
সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ, যিনি ২০২৪ সালে উৎখাত হয়ে মস্কোয় আশ্রয় নেন;
লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, যিনি ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিহত হন;
ইউক্রেনের ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ, যিনি ২০১৪ সালে ক্ষমতা হারিয়ে রাশিয়ায় পালান।
আর সেই সারিতেই ছিল পুতিনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ছবি।

শয়নকক্ষ থেকে নিউইয়র্কের আদালত
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স কমান্ডোরা মাদুরোকে তাঁর শয়নকক্ষ থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে মাদক পাচার সংক্রান্ত মামলায় বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এই অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে মোতায়েন থাকা রাশিয়ার সরবরাহকৃত বুক-২এমএ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার ধ্বংস করে। এসব সরঞ্জাম মস্কো–কারাকাসের তথাকথিত “কৌশলগত জোট”-এর অংশ ছিল।
তবে বাস্তবে রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটি ছিল বেশ অস্পষ্ট। কোনো বিদেশি হামলার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতার কথা সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদুরোর গ্রেপ্তারকে “অগ্রহণযোগ্য সশস্ত্র আগ্রাসন” বলে আখ্যা দিলেও পুতিন নিজে এ বিষয়ে একটি শব্দও বলেননি- সামরিক হস্তক্ষেপ তো দূরের কথা।

সমালোচনার মুখে পুতিনের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় রাশিয়ার জন্য ফলাফল দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে, ক্রেমলিনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে তাৎক্ষণিক আঘাত লেগেছে—যে ভাবমূর্তি আগে থেকেই চাপের মুখে ছিল। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেন ও সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলে, বিশেষ করে জ্বালানি-সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ায়, নিজেদের একচেটিয়া প্রভাব ধরে রাখার যুক্তি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে মস্কো।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্স’-এর প্রধান আলিশের ইলখামভ আল-জাজিরাকে বলেন, “লাতিন আমেরিকায় পুতিনের সবচেয়ে অনুগত মিত্র ছিলেন মাদুরো। তাঁর পতনে পুতিনের মর্যাদা ও সুনাম বড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে পুতিনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো- ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলছেন।”
ইলখামভের মতে, একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র হারানোর ক্ষতি কখনোই সেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। তিনি বলেন, “এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা আর আন্তর্জাতিক আইন বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি দাঁড়িয়ে আছে শক্তির অগ্রাধিকারের ওপর।”
গোপন সমঝোতা বৈঠক
মাদুরো ইস্যুতে রাশিয়ার নিষ্ক্রিয়তা অনেকের চোখে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় দামেস্ক পতনের সময়ের পুনরাবৃত্তি, যখন বিরোধীদের অগ্রযাত্রায় আসাদ মস্কোয় পালালেও রুশ সেনারা কার্যত নীরব ছিল।
একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকেই মাদুরোকে ‘বাদ’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ নিকোলাই মিত্রোখিন বলেন, “অ্যাঙ্কোরেজে বা তার আগেই বিশ্বকে প্রভাব বলয়ে ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।”
এই সমঝোতার অংশ হিসেবে ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্পের কাছ থেকে ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে রাশিয়া আর্কটিক অঞ্চলে যুদ্ধ-পরবর্তী যৌথ হাইড্রোকার্বন উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে। এর পাল্টা হিসেবে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হতে পারে গ্রিনল্যান্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
মিত্রোখিনের ভাষায়, “গ্রিনল্যান্ড দখলের ট্রাম্পীয় আকাঙ্ক্ষাও একই ছাঁচে গড়া- নিজের ‘বিশ্ব অংশের’ উত্তরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বাসনা।”
এর পর পশ্চিম সাইবেরিয়ার জলাভূমিতে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শেল তেল ভাণ্ডার- বাজেনোভস্কা স্বিতা, উন্নয়নে যুক্ত হতে পারে মার্কিন কোম্পানিগুলো। কারণ শেল তেল ও গ্যাস উত্তোলনে রুশ কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত।
কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক আলেক্সেই কুশচ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাজেনোভস্কা স্বিতা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে চীন সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। তা হলে বেইজিংয়ের জ্বালানি স্বনির্ভরতা নিশ্চিত হয়ে যাবে।”
ট্রাম্পের আরও কাছে যাচ্ছেন না পুতিন
কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশ্লেষক গালিয়া ইব্রাগিমোভা মনে করেন, “মাদুরোর ঘটনায় চোখ বন্ধ করে রাখলেও পুতিন ট্রাম্পের আরও ঘনিষ্ঠ হবেন না।”
তার মতে, পুতিন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন এই কারণে যে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহল থেকেই কেউ একজন যুক্তরাষ্ট্রকে গোপন তথ্য দিয়েছে। এই ঘটনা পুতিনের দীর্ঘদিনের সন্দেহপ্রবণ মনোভাবকে আরও তীব্র করবে। তিনি নিজের নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়াবেন।

ইব্রাগিমোভার ধারণা, মাদুরোর ‘অপহরণ’ পুতিনকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপহরণের পরিকল্পনা নিয়েও ভাবতে প্ররোচিত করতে পারে।
বন্ধুত্ব, অস্ত্র সহযোগিতা ও পতনের গল্প
২০০০ দশকের শুরুতে ক্ষমতায় এসে পুতিন ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক নেতা হুগো শাভেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শাভেজ রাশিয়া থেকে ট্যাংক, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। এমনকি ভেনেজুয়েলায় একে-৪৭ রাইফেল উৎপাদনের কারখানাও স্থাপন করে মস্কো।
রুশ বিশেষজ্ঞরা ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পুরোনো প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন হ্রাস ঠেকানো যায়নি। এর ফল হিসেবে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি ও ব্যাপক মেধাপাচারের মুখে পড়ে।
২০১৩ সালে ক্ষমতায় এসে মাদুরো অন্তত এক ডজনবার পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রতিবারই ছিল লালগালিচা সংবর্ধনা, জাঁকজমক আয়োজন আর ‘চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব’-এর প্রতিশ্রুতি।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে মাদুরো পুতিনকে চিঠি লিখে এস-৩০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র, সুখোই যুদ্ধবিমান মেরামত, রাডার এবং আর্থিক সহায়তা চান। মস্কো সেই চিঠির কোনো জবাব দিয়েছিল কি না, তা পরিষ্কার নয়।
এদিকে ক্রেমলিনঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকেরা মাদুরোর পতনকে রাশিয়াবিরোধী পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছেন। রিয়া নোভোস্তিতে কিরিল স্ত্রেলনিকভ লেখেন, “সমষ্টিগত পশ্চিম কখনোই রাশিয়াকে পরাজিত করার চেষ্টা থামাবে না। চেষ্টা করতে পারে—কিন্তু পতন হবে ভয়াবহ।”
সূত্র: আলজাজিরা