নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ যাতে আরও ভয়াবহ রূপ না নেয়, সে জন্য সংঘাত সীমিত রাখার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীরা। তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধ নিয়ে জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকলে আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ায় সেই কৌশল এখনই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত চারজনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। অভ্যন্তরীণ নীতিগত আলোচনা প্রকাশের অনুমতি না থাকায় তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
নভেম্বর পর্যন্ত সংঘাত সীমিত রাখার পরিকল্পনা
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদারের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে হোয়াইট হাউস। তবে এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ হামলা ছিল সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সেনা ও ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক চলাচলের ওপর হামলার জবাব।
আপাতত ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। কয়েক মাসের সামরিক অভিযানেও যেসব ছাড় আদায় করা সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যৎ আলোচনায় সেগুলো আদায়ে অর্থনৈতিক চাপকে কাজে লাগাতে চায় ওয়াশিংটন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখছি। তবে নভেম্বর আমাদের অগ্রাধিকার।”
সূত্রগুলোর মতে, নভেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধকে যতটা সম্ভব সীমিত রাখা গেলে সংঘাতটি নির্বাচনী প্রচারের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠা ঠেকানো সম্ভব হবে। এ সময় সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে লড়বে রিপাবলিকানরা।
যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমত নেতিবাচক
আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স ও ইপসোসের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিপরীতে ৬৩ শতাংশ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। বিশেষ করে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, সামরিক অভিযানে একটি কৌশলগত বিরতি মার্কিন বাহিনীকে তাদের ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া গোলাবারুদের মজুত পুনরায় পূরণের সুযোগও দিতে পারে।
তবে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বসন্তকাল কিংবা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় বর্তমানে যুদ্ধের তীব্রতা কম হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হওয়া এবং দেশের ভেতরে বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে না পড়ায় ইরানের নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি, জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরান মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে যেতে পারে।
এর জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ তৈরি হবে। এতে পাল্টাপাল্টি হামলা ধীরে ধীরে আরও তীব্র হয়ে দুই দেশ আবার পূর্ণমাত্রার বিমানযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সপ্তাহান্তে ইরানের লারাক দ্বীপে রকেট উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরান জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
এরপর মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের আরও কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ের পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা। নতুন করে শুরু হওয়া ওই সহিংসতায় ইরানের সামরিক সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বারবারা লিফ বলেন, “ইরানের শাসকদের এই ‘শান্ত’ পরিস্থিতি নষ্ট করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ শেষ পর্যন্ত এটি প্রকৃত শান্তি নয়; প্রশাসনের প্রকাশ্য লক্ষ্যই হলো ইরানের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো।”
ট্রাম্পের অবস্থানও অনিশ্চিত
সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথে আরেকটি বড় অনিশ্চয়তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে।
সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে ট্রাম্প সংঘাত আরও বাড়াতে আগ্রহী নন। তবে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য পরিচিত এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ইরান বিষয়ে নিজের অবস্থানও বদলাতে পারেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান সর্বশেষ মার্কিন হামলার জবাব দিলে সংঘাত আরও তীব্র করা হবে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ব্যর্থ ইরান যদি এই অত্যন্ত ন্যায্য হামলার জবাব দেয়, তাহলে তাদের আরও কঠোর ও উচ্চমাত্রায় আঘাত করা হবে। তবে সেটি সবচেয়ে বড় হামলা হবে না; সবচেয়ে বড় হামলা এখনও অপেক্ষমাণ।”
বুধবার ট্রাম্প বলেন, নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে তিনি মনে করেন না। একই সঙ্গে তিনি আবারও বলেন, আসন্ন নির্বাচন ইরান বিষয়ে তার কৌশল নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখছে না।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “প্রথমত, আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না। আমার দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং আমি আমার দলকে সহায়তা করব। তবে আমি মনে করি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার বিষয়টি আমার দল সম্মান করে।”
যুদ্ধের সপ্তম মাসে লজিস্টিক ও রাজনৈতিক চাপ
যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করায় সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “সময়সূচি বদলে গেছে।” আরেক কর্মকর্তা বলেন, “ইরানকে এখন সময়পঞ্জিই পরিচালিত করছে।”
আগস্টে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পুরো মজুতই ব্যবহার করে ফেলেছে।
রোববার ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানেরা পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথকে লিখিত মূল্যায়নে সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা টেকসই নয়। এতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে পেন্টাগনের দাবি, অভিযান পরিচালনার জন্য সামরিক বাহিনীর কাছে “প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে”।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছেন এবং ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির অবশিষ্ট দুর্বল অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট দেশে ও বিদেশে আমেরিকার স্বার্থ এগিয়ে নিতে থাকবেন এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না।”
অর্থনৈতিক চাপেই জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর কয়েকটি সাম্প্রতিক হামলার পর ওয়াশিংটনকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক কূটনীতিকেরা।
হোয়াইট হাউসের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ট্রাম্পের কয়েকজন শীর্ষ সহযোগী নভেম্বর পর্যন্ত ইরান সংঘাতকে তুলনামূলকভাবে ‘শান্ত’ রাখার পরিকল্পনার পক্ষে রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবরোধও অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন।
তবে বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা বলছেন, বাণিজ্য ও নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির নেতৃত্বকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা যায়নি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার বলেন, অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে সামরিকভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে উসকে দিতে পারে। এতে অর্থনৈতিক চাপের অভিযানই শেষ পর্যন্ত সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ ছাড়া চীনের মতো কয়েকটি বড় শক্তি ওয়াশিংটনের ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় যোগ দেয়নি। ফলে মার্কিন কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স প্লিটসাস বলেন, “নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের উদ্দেশ্য হলো অবরোধের কারণে তৈরি অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে আরও চাপ যোগ করা, যাতে ইরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে। কারণ প্রশাসন মনে করেছে, সামরিক পদক্ষেপে ফিরে যাওয়ার চেয়ে এটি ভালো বিকল্প।”
তিনি আরও বলেন, “ইরান এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু চীন ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে তারা এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত নয়। ফলে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
রয়টার্সের প্রতিবেদনটি করেছেন নন্দিতা বোস, হুমেইরা পামুক ও গ্রাম স্ল্যাটারি। অতিরিক্ত প্রতিবেদন করেছেন ইদ্রিস আলী। সম্পাদনা করেছেন কলিন জেনকিন্স, অ্যালিস্টেয়ার বেল, নিক জিমিনস্কি ও সঞ্জীব মিগলানি।