রবিবার, 18 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

পিয়ংইয়ংয়ের তৎপরতা রুখতে সিউলের বিশাল ড্রোন বাহিনী গড়ার মহাপরিকল্পনা

পার্শ্ববর্তী দেশ উত্তর কোরিয়ার সামরিক চ্যালেঞ্জ ও নানামুখী হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

পিয়ংইয়ংয়ের তৎপরতা রুখতে সিউলের বিশাল ড্রোন বাহিনী গড়ার মহাপরিকল্পনা
ছবি : সংগৃহীত

পার্শ্ববর্তী দেশ উত্তর কোরিয়ার সামরিক চ্যালেঞ্জ ও নানামুখী হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।


এই প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ সেনাসদস্যকে দক্ষ ‘ড্রোন যোদ্ধা’ হিসেবে প্রস্তুত করবে সিউল।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের এই মহাপরিকল্পনায় সম্মুখসারির সামরিক ইউনিটগুলোতে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি লাখো মানববিহীন ড্রোন মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কৌশলগত পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-বাক এই বিষয়ে জানান, প্রাথমিকভাবে ২০২৯ সালের মধ্যে দেশের চার বাহিনী— স্থল, নৌ, বিমান এবং মেরিন কোরের জন্য ১ লাখ ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেই সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে প্রায় ৬০ হাজারে নামিয়ে এনেছে। সংশোধিত এই লক্ষ্যমাত্রার মধ্য থেকে আনুমানিক ১১ হাজার ড্রোন চলতি বছরের মধ্যেই সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, নতুন উৎপাদিত এই ড্রোনগুলো সামরিক বাহিনীর সব শাখায় সমানভাবে বণ্টন করা হবে, যাতে প্রতিটি সৈনিকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ড্রোন একটি নিয়মিত ও অপরিহার্য হাতিয়ারে পরিণত হয়। চার বাহিনীর পাঁচ লাখ সামরিক সদস্যকে আধুনিক প্রযুক্তির এই আকাশযান পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-বাক মন্তব্য করেন যে, ড্রোন প্রযুক্তিকে এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই, বরং এটিকে এখন সাধারণ ও সর্বজনীন যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে গণ্য করতে হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি সেনার কাছে এই ড্রোন হওয়া উচিত তাদের ‘দ্বিতীয় ব্যক্তিগত অস্ত্র’।

নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তিনি জানান, ড্রোন উৎপাদনে সিউল এখন থেকে কোনো ধরনের চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করবে না, বরং শতভাগ দেশীয় উপাদানের ওপর নির্ভর করে এই প্রযুক্তি গড়ে তোলা হবে। দুই কোরিয়ার মধ্যেই যখন ড্রোন শক্তির প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই সিউলের পক্ষ থেকে এই বড় ঘোষণা এল।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতির উদাহরণ টেনে বলেন, ইউক্রেন সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো প্রমাণ করেছে যে ড্রোন এখন যেকোনো লড়াইয়ের গতিপথ বদলে দেওয়ার প্রধান নিয়ামক। অত্যন্ত কম খরচে বিপুল পরিমাণ ড্রোনের ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরনকে পুরোপুরি পাল্টে দিচ্ছে।

তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক করেন যে, উত্তর কোরিয়াও অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তাদের নিজস্ব মানববিহীন যুদ্ধাস্ত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক অবকাঠামো এবং বেসামরিক জনপদগুলোর ওপর বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় কেবল ড্রোন উৎপাদনই নয়, বরং ড্রোনের হামলা রুখতে অত্যাধুনিক লেজার প্রযুক্তি এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রের মতো ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর ওপরও সমান জোর দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি, সামরিক বাহিনীর পরিচালনার কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কার আনা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিটি ইউনিট কেন্দ্রীয় কমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যেকোনো মুহূর্তে নজরদারি চালানো এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাল্টা হামলা পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী খুব শিগগিরই শত্রুপক্ষের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালাতে সক্ষম এমন ২০ হাজারেরও বেশি স্বল্পমূল্যের একবার-ব্যবহারযোগ্য ড্রোন সংগ্রহ করতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি, আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত ‘ড্রোন-সোয়ার্ম’ (ঝাঁক বেঁধে চলা ড্রোন ব্যবস্থা) এবং লয়টারিং মিউনিশন অর্জনের প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে