অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাল গ্রামে ভয়াবহ সংঘর্ষে একই পরিবারের চার ফিলিস্তিনিসহ মোট ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দুই ইসরায়েলিও। কয়েক মাসের মধ্যে পশ্চিম তীরে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক সহিংসতার ঘটনা। তবে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি পক্ষের বর্ণনায় স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা গেছে।
শুক্রবার উত্তরাঞ্চলের তাল গ্রামে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের দাবি, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা (সেটলার) গ্রামে হামলা চালালে বাসিন্দারা তাদের প্রতিরোধে এগিয়ে যান। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ওই এলাকায় ভ্রমণে যাওয়া কয়েকজন ইসরায়েলির ওপর হামলার খবর পেয়ে সেনারা সেখানে যায়। তাদের দাবি, এক ফিলিস্তিনি এক নিরাপত্তারক্ষীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর সেনারা ওই হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে। আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত চার ফিলিস্তিনি একই পরিবারের সদস্য ছিলেন।
এ ঘটনায় আরও একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। তবে কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি আইডিএফ।
ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এলাকায় তারা ‘বিস্তৃত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর থেকেই পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও তাদের সম্পদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আহমেদ জেইদান বিবিসিকে বলেন, শুক্রবার সকালে প্রায় ৩০ জন বসতি স্থাপনকারী তাল গ্রামের ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। পরে খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এগিয়ে যান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা শুরু হয়।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাসীন ফাতাহ আন্দোলনের স্থানীয় নেতা ইসাম সাইফি রয়টার্সকে বলেন, বসতি স্থাপনকারীরাই প্রথমে গুলি চালায়। পরে ঘটনাস্থলে এসে ইসরায়েলি বাহিনীও গুলি শুরু করে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পাশাপাশি আরও কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
তবে আইডিএফের দাবি, হামলার সূচনা ফিলিস্তিনিরাই করেছিলেন।
সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা খবর পায় যে ওই এলাকায় ভ্রমণে যাওয়া ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা হয়েছে। ওই অঞ্চলের একটি অংশ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অন্য অংশে প্রশাসনিক দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের হাতে রয়েছে।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, ওই ভ্রমণের বিষয়ে আগে থেকে তাদের অবহিত করা হয়নি।
তাদের দাবি, কাছের একটি বসতি থেকে আসা এক নিরাপত্তারক্ষীর অস্ত্র এক ফিলিস্তিনি ছিনিয়ে নেন এবং সেই অস্ত্র দিয়েই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পরে সেনারা ‘সন্ত্রাসী হামলা চালানো ব্যক্তিকে নির্মূল করে’ বলে জানায় আইডিএফ। সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ বলেন, একই পরিবারের চার সদস্য ‘গুলিবিনিময়ের সময়’ নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনার দুটি ভিডিও স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিবিসি স্বাধীনভাবে ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
একটি ভিডিওতে ফিলিস্তিনিদের মুখোমুখি অবস্থানে ইসরায়েলি সেনা এবং বেসামরিক পোশাকে থাকা সশস্ত্র ইসরায়েলিদের দেখা যায়। গুলির শব্দের মধ্যেও কয়েকজন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক, এমনকি শিশুরাও ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিল। পরে বেসামরিক পোশাকে থাকা কয়েকজন সশস্ত্র ইসরায়েলিকে দুই ফিলিস্তিনিকে ধাক্কা ও লাথি মারতে দেখা যায়।
অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ফিলিস্তিনি একটি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের একজন অস্ত্রটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরপরই চারদিকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং একের পর এক গুলির শব্দ শোনা যায়। ওই ব্যক্তি অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন, একই সময়ে সেনারাও পাল্টা গুলি চালায়।
আইডিএফ জানিয়েছে, ২৭ বছর বয়সী এক ইসরায়েলি সেনা ‘অভিযান চলাকালে’ নিহত হয়েছেন। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, নিহতদের পাশাপাশি আরও দুই ইসরায়েলি আহত হয়েছেন।
ঘটনার পর ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাল গ্রামের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
তারা বলেছে, ‘সেটলারদের সন্ত্রাসবাদের এই ভয়াবহ বৃদ্ধি ইসরায়েলি সরকার ও দখলদার বাহিনীর দেওয়া সুরক্ষা, রাজনৈতিক সমর্থন এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সরাসরি ফল।’
আরও বলা হয়েছে, ‘ইসরায়েলের সরকারি উসকানি অব্যাহতভাবে এসব অপরাধকে উৎসাহিত করছে এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কোনো জবাবদিহি ছাড়াই বেড়ে চলেছে।’
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদক জানিয়েছেন, নাবলুস শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘটনাস্থলসংলগ্ন এলাকায় সেনারা সড়ক অবরোধ করে তল্লাশি চালাচ্ছে এবং আরও সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
পরবর্তীতে আইডিএফ জানায়, নাবলুসের একটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে গুলির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চিকিৎসা নিতে আসা দুই ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী এবং তাদের পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
পরে তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন এবং হাভাত গিলাদ বসতির কাছে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেন।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাল গ্রামের অভিযুক্ত ফিলিস্তিনি হামলাকারীর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ইহুদি বসতিগুলোকে বৈধতা দেওয়ার এবং নতুন বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ ধরনের বসতিগুলো সাধারণত পাহাড়ের চূড়ায় কয়েকটি অস্থায়ী ঘর বা ক্যারাভ্যান বসিয়ে গড়ে তোলা হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এগুলো অবৈধ। এমনকি সরকারি অনুমোদন ছাড়া নির্মিত এসব বসতি ইসরায়েলের নিজস্ব আইনেও বৈধ নয়।
ইসরায়েলের ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা এবং আইডিএফের রিজার্ভ মেজর জেনারেল ইয়াইর গোলান এক্সে লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহু ও কাটজের যৌথ বিবৃতি স্পষ্টভাবে পুরো অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
তাল গ্রামের ঘটনার পর উত্তর পশ্চিম তীরের আরও কয়েকটি গ্রামেও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ফারাতা গ্রামে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত একজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, ‘হত্যাকারীদের গ্রামগুলোর সঙ্গে গাজার মতোই আচরণ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক নিহত ইহুদির বিনিময়ে শত্রুপক্ষকে জমি ও ঘরবাড়ি হারানোর মূল্য দিতে হবে।’
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন নয়। তবে ফিলিস্তিনিদের হাতে ইসরায়েলি নিহত হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১ হাজার ১১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩৫টি মৃত্যু বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একই সময়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের হামলা অথবা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৪১ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। এরপর সেখানে শত শত ইহুদি বসতি গড়ে ওঠে, যেখানে বর্তমানে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করছেন। একই এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস। ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ।