বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক প্রশ্নের উত্তরে সরকারপ্রধান এই মন্তব্য করেন। উক্ত সংসদ সদস্য সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কিনা এবং এর স্থায়ী সমাধান কখন সম্ভব।
জিজ্ঞাসার জবাবে সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সরকার রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ অবসানের বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই প্রসঙ্গে অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অতীতে ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে সফল কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তৎকালীন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করা হয়েছিল। তাদের যোগ্য নেতৃত্বে সে সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকেরা অত্যন্ত দ্রুত নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকারও সেই পূর্বতন নীতিকে অনুসরণ করে একটি স্থায়ী, শান্তিপূর্ণ ও দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজছে। এ লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বহুপাক্ষিক সকল স্তরেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ধরে রাখতে সরকার সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থাগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ইউএনএইচসিআর, ইউএন ওমেন এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন, যার ফলে দেশটির পক্ষ থেকে মানবিক সাহায্য আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া, গত সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববাসীকে এই সংকটের সাথে সম্পৃক্ত রাখতে ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক মঞ্চে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার এই সংকটের মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত করে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই কারণে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রতি বাংলাদেশের নৈতিক সমর্থন বজায় রয়েছে।
সরকারপ্রধান জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। তাই সেখানে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি অন্যান্য সব পক্ষের সাথে যোগাযোগের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের কাজ নিয়মিত চলছে এবং তৃতীয় কোনো দেশে তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াও গতিশীল রয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রক্রিয়ার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করছে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক চাপ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর। সেখানে স্থিতিশীলতা ফেরাতে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে ফলপ্রসূ সংলাপ হওয়া জরুরি এবং এই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন শুরু করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।