রোমাঞ্চকর বিজয়ের পর চার বছর না যেতেই আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবানদের ভেতরের টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ২০২১ সালে মার্কিন সমর্থিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যেও শাসন চালিয়ে গেলেও, এবার তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার কাছে বাইরের হুমকির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নেতৃত্বের ভেতরের দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি তাঁর একটি ফাঁস হওয়া বক্তব্যের অডিও ক্লিপ বিবিসির হাতে এসেছে, যেখানে এই আশঙ্কার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
অডিওতে আখুন্দজাদাকে বলতে শোনা যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দল অব্যাহত থাকলে তা শেষ পর্যন্ত সবার পতন ডেকে আনতে পারে। তাঁর ভাষায়, এই বিভক্তির কারণে আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিত তালেবানের ইসলামী আমিরাত ভেঙে পড়বে এবং এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ কান্দাহারের একটি মাদ্রাসায় তালেবান সদস্যদের সামনে দেওয়া এই বক্তব্য সামনে এলেও, তালেবান নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই এমন বিভক্তির কথা অস্বীকার করে আসছে। এমনকি বিবিসির সরাসরি প্রশ্নের জবাবেও তারা বিষয়টি নাকচ করেছে।
তবে এই গুঞ্জনের সূত্র ধরে বিবিসির আফগান সার্ভিস গত এক বছর ধরে গভীর অনুসন্ধান চালায়। এ সময় বর্তমান ও সাবেক তালেবান সদস্য, স্থানীয় সূত্র, বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক কূটনীতিকসহ শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে ও বিষয়টির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এই অনুসন্ধানে প্রথমবারের মতো তালেবানের নেতৃত্বে দুটি স্পষ্টভাবে বিভক্ত অংশের অস্তিত্ব চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই বিপরীত।
একটি অংশ হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অনুগত গোষ্ঠী, যারা কান্দাহার থেকে সংগঠনটি পরিচালনা করে। এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য আফগানিস্তানকে একটি কঠোর ইসলামী আমিরাত হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত রেখে আখুন্দজাদার অনুগত ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তর নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
অন্যদিকে রয়েছে রাজধানী কাবুলকেন্দ্রিক গোষ্ঠী। এই অংশে থাকা প্রভাবশালী তালেবান নেতারা মনে করেন, কঠোর ইসলামী কাঠামোর মধ্যেও আফগানিস্তানের উচিত বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অর্থনীতি পুনর্গঠন করা এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার পথ খোলা রাখা।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা তালেবানঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি এই পরিস্থিতিকে ‘কান্দাহার বনাম কাবুল’ দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আখুন্দজাদা যখন হঠাৎ করে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও ফোন সেবা বন্ধের নির্দেশ দেন, তখনই এই দ্বন্দ্ব চরম আকার নেয়। তিন দিন পর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা হয়। বিবিসির দাবি, ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে— এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, যেখানে কাবুলভিত্তিক গোষ্ঠী আখুন্দজাদার নির্দেশ অমান্য করে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করে দেয়।
সব মিলিয়ে, আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যেখানে বাইরের চাপের চেয়েও ভেতরের বিভক্তিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।