নির্বাচনী ইশতেহারে তামাক নিয়ন্ত্রণের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার পর ভিন্ন পথে হাঁটছে বর্তমান সরকার। তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার উৎসাহিত হতে পারে—এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপে তামাকবিরোধী পরিবেশ ও স্বাস্থ্য কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ও আইনি পরিবর্তন
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সরকার ই-সিগারেট উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপর থেকে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নিয়েছে। একইসঙ্গে, তিন-ফসলি বা উচ্চ ফলনশীল কৃষিজমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধের যে বিধান ছিল, সেটিও বাতিল করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জানুয়ারিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে ডিসেম্বরে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভ্যাপিং ডিভাইস ও ই-লিকুইডের উৎপাদন, বিপণন ও বিজ্ঞাপনের ওপর কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়। কিন্তু সম্প্রতি সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংসদ উত্থাপনের আগেই এই নিষেধাজ্ঞার অংশটি বাদ দিয়ে দেয় এবং গত ১০ এপ্রিল এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়।
সাংঘর্ষিক অবস্থান ও বিশেষজ্ঞ মতামত
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসি-র নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এই পরিবর্তনকে পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন:
"এই আইনি পরিবর্তনগুলো বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। দলটি তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কথা বললেও, আইন শিথিল করার ফলে নতুন ধূমপায়ীদের সংখ্যা বাড়বে। এটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনৈতিক প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ।"
অন্যদিকে, কৃষিজমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ থেকেও তামাক চাষ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সরিয়ে নেওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারের ব্যাখ্যা
সরকারের এই অবস্থানকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ইশতেহার বাস্তবায়ন সেলের সদস্য জিয়াউদ্দিন হায়দার। তার দাবি, এসব পদক্ষেপে অঙ্গীকার ভঙ্গ হয়নি। ই-সিগারেটের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মূলত গবেষণার সুযোগ রাখার জন্য করা হয়েছে, গণহারে বিক্রির জন্য নয়।
তিন-ফসলি জমিতে তামাক চাষের বিষয়ে তিনি যুক্তি দেন, "আমাদের দেশে আইনের জঙ্গল তৈরি করার প্রয়োজন নেই। কৃষকরা যদি তামাক চাষে লাভ করতে পারে, তবে তাতে সমস্যা কোথায়? তামাক চাষে জমির ক্ষতি হলে কৃষকরা নিজেরাই তা বন্ধ করবে, এর জন্য কড়া আইনের প্রয়োজন নেই।"
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ গত ৯ এপ্রিল সরকারকে দেওয়া এক যৌথ চিঠিতে ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর মতে, ই-সিগারেট তরুণদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়। তামাকবিরোধী সংস্থাগুলো মনে করছে, আইনের এমন শিথিলতা অকাল মৃত্যুর এই মিছিলকে আরও দীর্ঘায়িত করবে এবং দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি স্বাস্থ্য-ঝুঁকির বোঝা তৈরি করবে।
সূত্র: ডেইলি স্টার