রবিবার, 18 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

তৃণমূলে বিদ্রোহ, বহিষ্কৃত ঋতব্রত হলেন বিরোধী দলনেতা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ। দলটির ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জীর মনোনীত পরিষদীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন। পরে বিধানসভার স্পিকারও তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ায় তৃণমূলের ভেতরের বিভক্তি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

তৃণমূলে বিদ্রোহ, বহিষ্কৃত ঋতব্রত হলেন বিরোধী দলনেতা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ। দলটির ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জীর মনোনীত পরিষদীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন। পরে বিধানসভার স্পিকারও তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ায় তৃণমূলের ভেতরের বিভক্তি নতুন মাত্রা পেয়েছে।


গত কয়েকদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, বুধবারের এই ঘটনাকে তার বাস্তব রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর মনোনীত পরিষদীয় নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত দলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

এর আগে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রস্তাবে থাকা বিধায়কদের স্বাক্ষর নিয়ে অসংগতির অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী ও তৃণমূলের আরেক বিধায়ক সন্দীপন সাহা।

পরে নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিষয়টি প্রকাশ্যে আনলে ঋতব্রত ও সন্দীপনকে দ্রুত দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বুধবার তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত ৫৮ জন বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করে একটি চিঠি বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা দেন। স্পিকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে।

বিধানসভায় যা ঘটল

বুধবার সকাল থেকেই একে একে বহু তৃণমূল বিধায়ক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় উপস্থিত হন। যদিও শুরুতে কেউ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি, তবে রাজনৈতিক মহলে ধারণা ছিল যে বিদ্রোহী শিবির নতুন পরিষদীয় নেতৃত্ব নির্ধারণে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।

বিধানসভায় প্রবেশের সময় ঋতব্রত ব্যানার্জী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি কোনো ‘জল্পনায়’ ‘ইন্ধন’ দিতে চান না। অন্যদিকে সন্দীপন সাহা দাবি করেন, তাদের সঙ্গে “দুই তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়কদের সমর্থন রয়েছে।”

কিছু সময়ের মধ্যেই জল্পনার অবসান ঘটে। স্পিকারের কাছে নতুন বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে উপদলনেতা ও মুখ্য সচেতকের নামও উল্লেখ করা হয়। সেখানে মমতা ব্যানার্জীকে দলনেত্রী হিসেবে রাখা হলেও বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয় ঋতব্রত ব্যানার্জীকে।

ঋতব্রতপন্থি বিধায়কদের সূত্রে জানা গেছে, স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন।

বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পাওয়ার পর ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেই এই দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি তার দাবি, ভবিষ্যতে আরও বিধায়ক তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।

বিবিসি বাংলাকে ঋতব্রত বলেছেন, “যদি কিছু ঠিক না হয় তাহলে হাউজের ভিতরে এবং বাইরে বিরোধিতা করব। আবার পজিটিভ কিছু হলে শুধুমাত্র বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করব না।”

তিনি আরও বলেন, “মমতা ব্যানার্জীকে আমাদের প্রধান পরামর্শদাতার ভূমিকায় থাকার অনুরোধ জানাব। মমতাদি থাকলে ভাল কাজ করতে পারব।”

ঋতব্রতকে সমর্থনকারী বিধায়কদের তালিকায় মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সদ্য সাবেক মন্ত্রী জাভেদ খানও রয়েছেন। এছাড়া কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা, সুজাপুরের বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন এবং রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানসহ তৃণমূলের একাধিক পরিচিত মুখ ওই তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তার প্রশ্ন, দল থেকে বহিষ্কৃত একজন ব্যক্তি কীভাবে তৃণমূলের বিরোধী দলনেতা হতে পারেন।

তিনি বলেন, “যারা জিতেছেন, যারা এটা করলেন তারা কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর আশীর্বাদে জিতেছেন, তার ছবি ব্যবহার করেই জিতেছেন। এটা ভুলে গেলেন কী করে?”

বিবিসি বাংলাকে কুণাল আরও বলেন, “এভাবে চোরাগোপ্তা পথে এসব করার কী দরকার ছিল? আমাদের দল কী করবে—তা ঠিক করা হবে। গতকাল আমরা নিয়াম মাফিক একটি চিঠি জমা দিয়েছি বিধানসভায়, তাদের মতো চোরাগোপ্তা পথে দিইনি।”

দল এই ঘটনার পর কী ধরনের সাংগঠনিক বা আইনি পদক্ষেপ নেবে, তা শিগগিরই জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে পরিষদীয় নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে দলের সব স্তরের কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে শাখা সংগঠনগুলোর কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা বিশ্লেষণের পর নতুন করে কমিটি গঠন করা হবে।

স্বাক্ষর বিতর্ক থেকেই সংকটের শুরু

নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেস শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা, অসীমা পাত্র ও নয়না ব্যানার্জীকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব দেয়।

তবে ওই প্রস্তাবে থাকা বিধায়কদের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর থেকেই সংকটের সূত্রপাত। স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা।

এ ঘটনায় হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং পরে তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার জানান, তদন্তে দেখা গেছে কিছু স্বাক্ষর ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে করা হয়েছে এবং কয়েকজন বিধায়ক সিআইডিকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবনায় থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়।

এই ঘটনার পর থেকেই তৃণমূলে ভাঙনের আলোচনা আরও জোরালো হয়। নির্বাচনে ভরাডুবির পর দলের ভেতরে বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে অভিষেক ব্যানার্জী ও দলটির পরামর্শক সংস্থা আইপ্যাককে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে আসে।

স্বাক্ষর বিতর্ক প্রকাশ্যে আসার পর বিদ্রোহী শিবিরে বিধায়কদের সমর্থন বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার মমতা ব্যানার্জীর ডাকা ধর্না কর্মসূচিতে নয়না ব্যানার্জী, কুণাল ঘোষসহ কয়েকজন নেতা উপস্থিত থাকলেও দলের অনেক বিধায়ক সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা