শুক্রবার, 16 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ইরান যুদ্ধে পাঠানো মার্কিন রণতরির ৫ হাজার সেনা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযানে টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে কাটাচ্ছেন মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনারা। দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময় না থাকায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, খাবার-পানি সংকট এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমনকি কয়েকজনের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার কথাও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

ইরান যুদ্ধে পাঠানো মার্কিন রণতরির ৫ হাজার সেনা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযানে টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে কাটাচ্ছেন মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনারা। দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময় না থাকায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, খাবার-পানি সংকট এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমনকি কয়েকজনের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার কথাও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।


সম্প্রতি সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক টাউন হল সভায় নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এসব অভিযোগ ও উদ্বেগ তুলে ধরেন। সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাওসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আনুমানিক ২০০ জন অংশ নেন।


সভায় উপস্থিত এক নাবিকের স্ত্রী জানান, সেদিনই তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান। আবেগাপ্লুত অবস্থায় তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী লিখেছেন, ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’


পরিবারটির দাবি, এমন গুরুতর বক্তব্যের বিষয়ে কর্মকর্তারা সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন ও চিকিৎসক সুবিধা রয়েছে বলে তাঁরা আশ্বস্ত করেন। পাশাপাশি আরও মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ যুদ্ধজাহাজটিতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান কর্মকর্তারা।


টানা ২৫০ দিনের সমুদ্রযাত্রায় চরম ক্লান্তি


সাম্প্রতিক টাউন হলের অভিযোগের সঙ্গে গত কয়েক সপ্তাহে নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে দেওয়া বক্তব্যেরও মিল রয়েছে। তাঁদের সাক্ষাৎকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রু সদস্যদের পোস্ট ও মন্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে মানসিক চাপ ও ক্লান্তির চিত্র উঠে এসেছে।


নাবিক ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কয়েকজন আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন। এমনকি অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।


মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীনে ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ দিন সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিয়েছেন জাহাজটির নাবিকেরা। সব মিলিয়ে টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে অবস্থানের নজিরবিহীন চাপের মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।


গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে সান ডিয়েগো ছাড়ে বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। এরপর থেকে কোনো নিয়মিত বন্দরবিরতি ছাড়াই আট মাসের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে জাহাজটি।


পরিকল্পনা অনুযায়ী গত মে মাসে এই মিশন শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এখনো দেশে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানায়নি মার্কিন প্রশাসন।


খাবার-পানি ও বিশ্রাম নিয়েও অভিযোগ


নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্য থাকা আব্রাহাম লিংকনে একপর্যায়ে খাবার ও পানির সংকট দেখা দেয়। এর সঙ্গে ছিল চিঠি ও ডাক যোগাযোগে সমস্যা এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টা।


সাধারণত দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সময় নাবিকদের বিশ্রাম ও রসদ সংগ্রহের জন্য নিয়মিত ‘পোর্ট কল’ দেওয়া হয়। মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো বন্দরে নোঙর করে। কিন্তু দীর্ঘ এই মোতায়েনে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা সেই সুযোগ প্রায় পাননি।


এক নাবিক বলেন, ‘পুরো মোতায়েনজুড়ে আমরা কোনো বিরতি ছাড়াই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছি।’


তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে ক্রুরা আর বন্দরবিরতির অপেক্ষায় নেই। তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা দ্রুত দেশে ফেরার নিশ্চয়তা। তাঁর আকুতি, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’


নৌবাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ ও বজায় রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে।


সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ


গত জুলাইয়ে এক অভিভাবক ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে চিঠিতে তাঁর ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমার ছেলে বর্তমানে ওই যুদ্ধজাহাজে আছে। সে এবং তার সহকর্মীরা একটু স্বস্তি পেতে প্রতিনিয়ত জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে, এটি শোনা একজন বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রাতে ঘরের নরম বিছানায় আরামে ঘুমাই, অথচ আমাদের প্রিয়জনেরা ওখানে যুদ্ধ করছে। তারা আসলে কিসের জন্য জীবন বাজি রাখছে, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’


জাহাজে থাকা কয়েকজন নাবিকের দাবি, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল। একজন নাবিক বলেন, ‘আমাদের এখানে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দায়িত্বরত প্রহরীদের এক নাবিককে সাগরে লাফ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।’


ঘটনাটি জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে সবাইকে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তাঁরা। তবে নির্দিষ্ট ওই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।


তবে বাহিনী জানিয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সব সময়ই পরিবারগুলোর কথা শুনতে, সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়াতে এবং আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য নিরাপদে ও সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’


কিছু সমস্যা কাটলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি


নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, এর আগে জাহাজে খাবার রেশন করে দেওয়া, তীব্র পানির সংকট এবং এক সপ্তাহেরও বেশি সময় কাপড় ধোয়ার সুযোগ না পাওয়ার মতো সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। তাঁদের মতে, এসব সমস্যার বড় অংশ এখন সমাধান হয়েছে এবং ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।


গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে স্বল্প সময়ের জন্য থামার সুযোগ পায় যুদ্ধজাহাজটি। তখন কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফল ও সবজি পান। যদিও অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দরের নির্দিষ্ট সুরক্ষিত এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।


এর আগে গত ডিসেম্বরে গুয়াম দ্বীপেও সংক্ষিপ্ত বিরতি নিয়েছিল আব্রাহাম লিংকন। তবে জাহাজের অনেক নাবিক তখনও তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে তাঁদের স্ত্রীদের ভাষ্য।


এক নাবিকের স্ত্রী বলেন, ‘নিজের মানুষের (নাবিক) এই অবস্থা দেখাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমি চোখের সামনে আমার স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা যেন সব আশাই হারিয়ে ফেলছে।’


নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সামরিক সংঘাতের কারণে ব্যাহত হচ্ছে।


তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি রসদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী এবং সবশেষে ডাক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জাহাজে পরিষ্কার পানি, কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং প্রতিটি খাবারে দুটি আমিষ পদ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। রসদ সরবরাহ পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।


দেশে ফেরার তারিখ জানানো হয়নি


গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দুটি সভায়—একটি সরাসরি এবং অন্যটি অনলাইনে—নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো এবং নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিল। ভারপ্রাপ্ত নৌ সেক্রেটারি হাং কাও সরাসরি সভায় উপস্থিত ছিলেন।


সভায় এক নারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’


সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউএসএনআই নিউজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের মোতায়েন শেষে দেশে ফেরার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আব্রাহাম লিংকন আবার প্রশান্ত মহাসাগরে যাওয়ার জন্য সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং গত জানুয়ারিতে এটি সেখানে পৌঁছায়। এরপর থেকে যুদ্ধজাহাজটি আরব সাগরেই অবস্থান করছে।


নাবিকদের স্ত্রীদের দাবি, সামরিক নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কর্মকর্তারা জাহাজটির দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময় জানাতে রাজি হননি।


এদিকে, ‘মিলিটারি মেডিসিন’ জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও মোতায়েনকালে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগকে নাবিকদের মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবকেও বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।


দীর্ঘ ২০ বছর নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন এবং চারবার মোতায়েন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যানের মতে, একটি মোতায়েন কখন শেষ হবে তা জানা না থাকলে নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি হয়।


দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন। আপনি আপনার সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।’


সংকটের গভীরতা বোঝাতে তিনি আরও বলেন, ‘সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেক লম্বা সময় সমুদ্রে থাকবেন, তখন মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা একটা সময় এসে থমকে যাবে…আর ঠিক সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করবে।’