সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

জাতিসংঘে নতুন বিশ্ব মানচিত্র অনুমোদন, যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি কেন?

বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে মহাদেশগুলোর আকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রকৃত আয়তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব বিপুল ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। নতুন এই মানচিত্রে আফ্রিকার আকার তুলনামূলকভাবে বড় দেখা যাবে, আর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আগের তুলনায় ছোট দেখাবে।

জাতিসংঘে নতুন বিশ্ব মানচিত্র অনুমোদন, যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি কেন?

বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে মহাদেশগুলোর আকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রকৃত আয়তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব বিপুল ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। নতুন এই মানচিত্রে আফ্রিকার আকার তুলনামূলকভাবে বড় দেখা যাবে, আর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আগের তুলনায় ছোট দেখাবে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ১৬৪টি সদস্যরাষ্ট্র প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করে বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। আরও ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

‘ইকুয়াল আর্থ’ নামে পরিচিত নতুন কার্টোগ্রাফিক প্রজেকশনকে জাতিসংঘের প্রস্তাবনায় বিশ্বের স্থলভাগের তুলনামূলকভাবে আরও নির্ভুল ও বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৫৬৯ সালে ফ্ল্যামিশ মানচিত্রকর জেরার্ডাস মার্কেটরের তৈরি প্রচলিত ‘মার্কেটর প্রজেকশন’-এর পরিবর্তে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে নতুন এই পদ্ধতি ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

কেন বদলানো হচ্ছে প্রচলিত মানচিত্র

প্রায় চার শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশন মূলত সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের দিক নির্ধারণের সুবিধার জন্য তৈরি হয়েছিল। গোলাকার পৃথিবীকে সমতল মানচিত্রে উপস্থাপন করতে গিয়ে এতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চল তুলনামূলক ছোট এবং উত্তর গোলার্ধের অঞ্চলগুলো বাস্তবের চেয়ে অনেক বড় হয়ে দেখা যায়।

এর ফলে মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডের আয়তনকে প্রায় আফ্রিকার সমান মনে হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপের আয়তনও প্রচলিত মানচিত্রে প্রকৃত আকারের তুলনায় অনেক বেশি বড় দেখানো হয়।

২০১৮ সালে একদল মানচিত্রকর ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে মহাদেশগুলোর আকৃতি ও আনুপাতিক আয়তন যতটা সম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে নতুন প্রজেকশনে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়ার মতো অঞ্চল তুলনামূলকভাবে বড় ও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা

নতুন মানচিত্র গ্রহণের উদ্যোগে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ভোটের আগে জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে জাতিসংঘ তার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত বৈশ্বিক সংকটগুলোতে নজর না দিয়ে এই সংস্থা ১৬০০ শতাব্দীর মানচিত্র প্রকল্প এবং ভৌগোলিক ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক করছে।’

প্রস্তাবটির সহ-উদ্যোক্তা টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসে অবশ্য এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘মানচিত্র কেবল ভূগোল শেখায় না, এটি মানুষের কল্পনাশক্তিতে প্রভাব ফেলে এবং বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের মানসিক ধারণাকে গড়ে তোলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মানচিত্রই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। যখন বছরের পর বছর ধরে একটি বিকৃত মানচিত্র দেখানো হয়, তখন তা জাতিগত ভুল ধারণা টিকিয়ে রাখে।’

ফ্রান্সের সমর্থন

প্রস্তাবটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ফ্রান্স। দেশটি প্রচলিত মানচিত্র ব্যবহারের পরিবর্তে নতুন প্রজেকশন গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘মানচিত্র পরিবর্তন করলেই বিশ্ব বদলে যাবে না, তবে বিকৃত উপস্থাপন সংশোধন করা সত্য প্রতিষ্ঠায় একটি বড় পদক্ষেপ।’

সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকায় নিজেদের সাবেক উপনিবেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে ফ্রান্স। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন মানচিত্রের প্রস্তাবে দেশটির সমর্থনকে আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকেরা।