ভেনেজুয়েলায় চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বাড়ার পর, যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদেরকে দেশটি ত্যাগ করার জন্য দ্রুত সতর্ক করেছে। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এখন ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নাগরিকদের জন্য উচ্চমানের ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার কারণে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর শনিবার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগ করতে হবে। এর মূল কারণ, সশস্ত্র আধা সামরিক গোষ্ঠী 'কোলেক্তিভোস' সহ সরকারপন্থী মিলিশিয়াগুলোর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। এরা সড়কপথে তল্লাশি চালিয়ে মার্কিন নাগরিকদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই গোষ্ঠীগুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত করে মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে এবং তাদের খোঁজে সড়ক অবরোধ করছে।
তবে, সতর্কতায় বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলায় থাকা মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যাতায়াতের সময় বিশেষভাবে সাবধান থাকতে হবে। দেশটিতে কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়ায়, দ্রুত দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মাদুরোকে আটক করার এক সপ্তাহ পর, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা সফরের পরিকল্পনা করছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, "কারাকাসে অনুষ্ঠিত একটি রাতের অভিযান ও ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের পতনের পর, যুক্তরাষ্ট্র এখন কার্যত দেশটি 'চালাচ্ছে'।" তিনি বলেন, "আমি মনে করি, কোনও এক সময় পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে উঠবে।"
তবে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সতর্কতা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও কতটা অস্থির এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ বাহিনীর অভিযানে বহু মানুষ নিহত হলেও, পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।
ভেনেজুয়েলায় তেল বিনিয়োগের আহ্বান
এদিকে, ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর জন্য 'সম্পূর্ণ নিরাপত্তা' নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সেখানে শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বড় বিনিয়োগ লাভজনক হবে এবং তা মার্কিন তেলের বাজারে লাভ আনবে।
হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ট্রাম্প তেল কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের বলেন, "ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করলে তারা 'সম্পূর্ণ নিরাপত্তা' পাবে।" তিনি আরও জানান, এসব কোম্পানিগুলো নিজেদের অর্থ—প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার—বিনিয়োগ করবে, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে নয়। তিনি সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ রক্ষায় সাহায্য করা হবে।
তবে, অনেক তেল কোম্পানি এখনও বিনিয়োগের বিষয়ে সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। একাধিক শীর্ষ নির্বাহী জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা 'বিনিয়োগে অনুপযোগী' দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং সেখানে আইনি ও যৌক্তিক সংস্কার না হলে বড় বিনিয়োগ সম্ভব নয়।
ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া
এদিকে, মাদুরো সরকারের বিরোধীরা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন জানালেও, সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে ‘ঔপনিবেশিক আগ্রাসন’ হিসেবে নিন্দা করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা ‘মনগড়াভাবে তৈরি করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে’ করা হয়েছে। তারা আরও দাবি করেছে, দেশটি বর্তমানে 'সম্পূর্ণ শান্ত, স্থিতিশীল ও নিরাপদ' অবস্থায় রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, “জনবসতি, যোগাযোগপথ, চেকপোস্টসহ সব নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং রাজ্যের অস্ত্র ও নিরাপত্তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও অস্থির হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ এখন এই দেশটির দিকে। মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সতর্কতা জারি করেছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে, পরিস্থিতি কতটা গভীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ভেনেজুয়েলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কার্যক্রম কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ শান্তি নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তর নিরাপত্তার জন্যও এক বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।