‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’—এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সায়মা রহমান তুলি। নিজের স্বপ্নের বাস্তবায়ন এবং প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া নারীদের স্বপ্ন দেখতে শেখানোর মাধ্যমে তিনি স্বনির্ভর, স্বাধীন নারী সমাজ বিনির্মাণ- জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়ন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি—এই তিন ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তিনি।
পেশায় কমিউনিকেশন এক্সপার্ট হলেও বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের পরিচয়কে বিস্তৃত করেছেন এই গুণী শিল্পী ও সমাজকর্মী। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি তিনি একজন নিউরো-লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিং (এনএলপি) প্র্যাকটিশনার্স হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, গ্রুমিং সেশন ও মোটিভেশনাল কার্যক্রমেও তিনি যুক্ত। লেখালেখির জগতে তিনি ‘ইয়ারা’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে তার লেখা ‘ডার্ক সাইকোলজি’ বইটি পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
শৈশব ও বেড়ে ওঠা
ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার নবাবগঞ্জ বাজারে এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সায়মা রহমান তুলি। তিনি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ২৫ সেপ্টেম্বর তার জন্মদিন। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে থিয়েটারে যুক্ত ছিলেন তিনি।
শিশুশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে মিডিয়ায় পথচলা শুরু হয় তার। পাশাপাশি ‘অপেক্ষা’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে নবাবগঞ্জ ললিতকলা একাডেমি (নাফা)-এর সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং বর্তমানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি, নারী ক্ষমতায়ন ও শিশু বিষয়ক নানা গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।
নারী ক্ষমতায়নে ভূমিকা
প্রান্তিক নারীদের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি ‘ইনভিশন অ্যাকশন রিওয়ার্ড অ্যাসেট (ইয়ারা)’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তুলি। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ছাড়াও দোহার, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের কিছু এলাকায় এই কার্যক্রম চালু রয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য নারীদের আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও স্বাবলম্বী করে তোলা। তুলির মতে, বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক নারী পিছিয়ে থাকছেন। এ বাস্তবতা পরিবর্তনেই কাজ করে যাচ্ছে তার সংগঠন।
গত পাঁচ বছর ধরে ইয়ারার মাধ্যমে বিনামূল্যে মোটিভেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বয়সভিত্তিক এই কর্মসূচির আওতায় ছোট শিশুদের জন্য গুড টাচ-ব্যাড টাচ ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, কিশোরীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও ক্যারিয়ার দিকনির্দেশনা, তরুণীদের জন্য চাকরি প্রস্তুতি এবং নারীদের জন্য সম্পর্ক ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সায়মা রহমান তুলি
বাংলার প্রাচীন মুখোশনৃত্য ‘কাচনাচানি’ নিয়ে প্রথম গবেষণা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন তুলি। এ বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন কলকাতায় অবস্থান করে এর ঐতিহ্য ও নান্দনিক দিক নিয়ে কাজ করেছেন। তার মতে, কাচনাচানি একটি প্রাচীন কৃত্যনৃত্য, যা চৈত্রসংক্রান্তিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবদেবীর মুখোশ পরে পরিবেশন করেন এবং এটি বাংলা নাটকের অন্যতম প্রাচীন মাধ্যম, যা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।
লেখালেখি ও প্রকাশনা জগৎ
সায়মা রহমান তুলি মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘একাকিত্ব ও মনের যত্ন’ এবং ‘ডার্ক সাইকোলজি’।
‘একাকিত্ব ও মনের যত্ন’ বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একাকিত্বকে দুর্বলতা না বানিয়ে আত্মোন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। এতে তিনি ‘ইয়ারা থিওরি’ উপস্থাপন করেছেন, যেখানে কল্পনা, পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের সমন্বয়ে সফল জীবনের পথ নির্দেশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ‘ডার্ক সাইকোলজি’ বইয়ে আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে উত্তরণের পথ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।







