বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানো প্রয়াত এম সাইফুর রহমানের স্মৃতি, পারিবারিক ঈদ উদযাপন এবং সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে এক ঘরোয়া আড্ডায় মুখর হয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে।
মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান এবং তাঁর সহধর্মিণী সম্প্রতি তাসনোভা-এর একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনের নানা অজানা অধ্যায় তুলে ধরেন।
প্রয়াত অর্থমন্ত্রীর গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় স্মরণ করে এম নাসের রহমান জানান, তাঁর বাবার ব্যক্তিত্বের এক বিশাল প্রভাব সবসময়ই পরিবারের ওপর রয়ে গেছে। সফল এক অর্থমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরেই তিনি বাড়তি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। বাবার অনন্য জীবনধারা কেবল তাঁদের পরিবারকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং গোটা দেশকে অনুপ্রাণিত করেছে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় অর্থমনোনীত ব্যক্তি হিসেবে তিনি আমজনতার অন্তরে যে স্থায়ী আসন তৈরি করেছেন, তা সত্যিই বিরল।
নাসের রহমান নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেন। বাবার পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও স্থানীয় কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধেই মূলত তিনি জনসেবায় যুক্ত হন। রাজনৈতিক পথচলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০০০ সালের নির্বাচনসহ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে তাঁকে চরম প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে এক-এগারোর সংকটময় মুহূর্তে যখন একাধিক মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হন, তখনো তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। আর এই পুরো সময়ে মৌলভীবাজারের সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনই ছিল তাঁর পথচলার মূল শক্তি।
কঠিন দিনগুলোতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব স্বামীর পাশে থাকার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে নাসের রহমানের সহধর্মিণী জানান, এক-এগারোর সেই থমথমে দিনগুলোতে গভীর রাতে কুয়াশা উপেক্ষা করে স্বামীকে দেখতে তিনি একা গাড়ি চালিয়ে কাশিমপুর কারাগারে ছুটে গেছেন। সন্তানদের আগলে রাখার পাশাপাশি স্বামীর অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী মাঠে নেমে নারী ভোটারদের সংগঠিত করার কাজটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তবে মৌলভীবাজারের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মানের কারণে কোনো বাধাই তাঁর কাছে দুর্ভেদ্য মনে হয়নি।
পারিবারিক ঈদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, বিয়ের পর দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকলেও প্রতি বছরই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তাঁরা মৌলভীবাজারে ছুটে আসতেন। বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময়টুকু ছাড়া নাসের রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কখনো ঢাকার মাটিতে কোরবানি দেননি, সবসময়ই গ্রামের মানুষের সাথে ঈদ কাটাতে পছন্দ করেছেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর শাশুড়ি সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে ভালোবাসতেন, যার ফলে তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান তৈরি হয়েছে। বিয়ের পর থেকে রমজান ও ঈদে ইফতারির ঐতিহ্যবাহী পদগুলো তিনি নিজ হাতে তৈরি না করলে পরিবারের চলত না। এছাড়া প্রয়াত অর্থমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী লাল রঙের গরু পছন্দ করতেন বলে প্রতি কোরবানির ঈদে গ্রামীণ হাট থেকে লাল গরু কেনাটা ছিল এই পরিবারের দীর্ঘদিনের চেনা রেওয়াজ।
ভবিষ্যতে পরিবারের এই রাজনৈতিক ধারা বজায় থাকবে কি না—এমন প্রশ্নে নাসের রহমানের সহধর্মিণী অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে তাঁদের মেজো মেয়ের কথা উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর যিনি লন্ডন বিজনেস স্কুল থেকে উচ্চতর এমবিএ ডিগ্রি নিয়েছেন। মায়ের মতে, মেজো মেয়ের মধ্যে তার দাদা এম সাইফুর রহমানের মতো চমৎকার রাজনৈতিক গুণাবলী রয়েছে। বিগত নির্বাচনে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে যেভাবে সে সংগঠিত করেছে, তা দেখে স্থানীয়রা মুগ্ধ হয়েছেন। এমনকি এলাকার মানুষ এখন মায়ের চেয়ে মেয়েকেই বেশি খোঁজেন। ফলে আগামী প্রজন্মে তার রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা ও সৌজন্যতাবোধের গুরুত্ব তুলে ধরে এই দম্পতি উল্লেখ করেন, মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনোই চরম বৈরিতা বা সংঘাত ছিল না; এখানে সব মতাদর্শের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে। সবশেষে আগামীর বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এম নাসের রহমান বলেন, তাঁরা এমন এক রাষ্ট্র দেখতে চান যেখানে প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং রাজনীতি থেকে প্রতিহিংসা ও হানাহানি চিরতরে দূর হবে। এম সাইফুর রহমানের সততা ও জনকল্যাণের আদর্শকে ধারণ করে তরুণ প্রজন্ম দেশকে একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে—ঈদের বিশেষ এই আয়োজনে এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন এই দম্পতি।







