ইয়েমেনের অবরুদ্ধ তাইজ শহরে জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম। অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর অভাবের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে রোগীদের জীবন। পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি হাসপাতালে নবজাতকদের জন্য ব্যবহৃত ইনকিউবেটরের সংখ্যা ৪০টি থেকে কমিয়ে মাত্র ১০টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে অকালজাত ও অসুস্থ শিশুদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তাইজের ইয়েমেনি-সুইডিশ হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা বিভাগের নার্স নাদা আহমেদ বলেন, অক্সিজেন নেই, ইনকিউবেটর চালানোর জ্বালানি নেই, এমনকি শিশুদের উষ্ণ রাখারও ব্যবস্থা নেই।
বিভাগটির তত্ত্বাবধায়ক নওয়াল নাজিব সতর্ক করে বলেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নবজাতকদের মৃত্যুর পাশাপাশি স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ অক্টোবর থেকে তাইজ শহরটি অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় শহরটিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিক মানুষের বেরিয়ে যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাইজ-আদেন করিডরসহ গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বন্ধ থাকায় খাদ্য, পানি ও জ্বালানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে বাস্তুচ্যুত আড়াই লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেকই তাইজ শহরে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার জানান, শহরটির ৪২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জ্বালানি, অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় গাড়িচালক আবদুল্লাহ আল-রাদফানি জানান, তাইজে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম বেড়ে দুই হাজার ইয়েমেনি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। অক্সফাম ইয়েমেনের নীতি ও গণমাধ্যমবিষয়ক ব্যবস্থাপক ফাতমা জাফর শোতাহ জানান, এক কিডনি রোগী যাতায়াতের খরচ বহন করতে না পেরে চিকিৎসাকেন্দ্রেই দুই রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। আগে যাতায়াতে যেখানে প্রায় আধা ডলার খরচ হতো, এখন সেখানে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০ ডলার।
তাইজের বাইরেও জ্বালানি সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় আদেন ও লাহিজ প্রদেশের হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে অস্ত্রোপচারকক্ষ ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি খাদ্যাভাব ও অপুষ্টিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, তাইজ ও আশপাশের এলাকায় আট লাখের বেশি মানুষ খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস জানান, চলতি বছরে তাইজে পরীক্ষা করা এক লাখ ৬৮ হাজার শিশুর মধ্যে ৫২ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত।
ইউনিসেফ প্রায় আট হাজার কার্টন জীবনরক্ষাকারী বিশেষ পুষ্টিকর খাবার মজুত করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব খাবার দিয়ে প্রায় তিন মাস চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে নিরাপত্তাহীনতা ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ভবিষ্যতে এসব খাবার সরবরাহ এবং অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এমএসএফ জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিম উপকূলের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলোর কারণে দক্ষিণ ইয়েমেনে শিশুদের অপুষ্টির পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আদেন ও লাহিজে সংস্থাটির ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৯৯ শিশুর পুষ্টি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৪৪ শিশু বা ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ মাঝারি মাত্রার তীব্র অপুষ্টিতে এবং ২৮ শিশু বা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছে। গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন।
এমএসএফের ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক সারা ঘানেম বলেন, প্রতিদিন তারা যেখানেই চিকিৎসাসেবা দিতে যাচ্ছেন, সেখানেই অন্তত এক বা দুই শিশুকে গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছেন।