ইসরাইলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। হিজাব খুলতে বাধ্য করা, মারধর, নির্জন কারাবাস, কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহারের মতো ঘটনার কথা জানিয়েছে বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন। এসব ঘটনায় কয়েকজন নারী গুরুতর শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এক অন্তঃসত্ত্বা বন্দিও। তাকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের ক্লিনিকে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ ও ৮ অক্টোবর এসব ঘটনা ঘটে। এ সময় কারারক্ষীরা নারী বন্দিদের চুল পরীক্ষা করার কথা বলে হিজাব খুলতে বাধ্য করেন। পাশাপাশি কয়েকজনকে মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। বন্দিদের কক্ষ ও গোসলখানায় রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থ ছোড়ার অভিযোগও উঠেছে।
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস জানায়, ১৭ জন ফিলিস্তিনি নারীকে প্রায় তিন ঘণ্টা একটি কক্ষে আটকে রেখে চুলের বেণি খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ১৫ জন বন্দির একটি দলকে লক্ষ্য করে পিপার স্প্রে ছোড়া হলে তারা বমি করতে থাকেন এবং তীব্র শারীরিক অস্বস্তিতে পড়েন।
সংগঠনটি এসব আচরণকে নারী বন্দিদের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শারীরিক নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
হিজাব খুলতে বাধ্য করে তিন ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলি কারাগারের এক কর্মকর্তা ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের চুল পরীক্ষা করার জন্য হিজাব খুলতে বাধ্য করেন।
পরীক্ষার পর ১৭ জন বন্দিকে ১৩ নম্বর কক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এ সময় তাদের চুলের বেণি খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংগঠনটির অভিযোগ, নারীদের চুল প্রকাশ করতে বাধ্য করা এবং পরে একটি কক্ষে আটকে রাখার ঘটনা ছিল অপমানজনক। এতে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এ ঘটনার পাশাপাশি নারী বন্দিদের বিভাগে আরও হামলা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
মারধরের পর গ্যাসভর্তি কক্ষে ফেরানোর অভিযোগ
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের দাবি, ইসরাইলি কারারক্ষীরা নারী বন্দিদের থাকার বিভাগের আঙিনায় কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা নিক্ষেপ করেন। এতে কয়েকজন বন্দি শ্বাসকষ্টে ভোগেন।
পরে বিভিন্ন কক্ষ থেকে বন্দিদের বের করে এনে প্রায় এক ঘণ্টা মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। এরপর গ্যাসে ভরা কক্ষগুলোতেই তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া ৯ নম্বর কক্ষে পৃথক অভিযানের সময় কারারক্ষীরা বন্দিদের পায়ে মারধর করেন বলেও জানানো হয়েছে।
সংকীর্ণ ও আবদ্ধ স্থানে রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থের সংস্পর্শে আসায় নারী বন্দিদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। বিশেষ করে আগে থেকেই অসুস্থ বন্দিদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
পিপার স্প্রেতে অসুস্থ হয়ে পড়েন বন্দিরা
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ৮ অক্টোবর ইসরাইলি কারারক্ষীরা ১৫ জন ফিলিস্তিনি নারী বন্দি থাকা একটি কক্ষে প্রচুর পরিমাণে পিপার স্প্রে ছোড়েন।
এর প্রভাব পাশের কক্ষগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে বন্দিরা বমি করতে থাকেন। ওই বিভাগের বয়স্ক নারীরাও এর শিকার হন।
একজন বন্দিকে অন্য নারীরা বহন করে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। আরেকজন হাঁটার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া গোসলখানায় থাকা নারী বন্দিদের লক্ষ্য করেও রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থ ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে।
আক্রান্তদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। তার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হলে তাকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের ক্লিনিকে নেওয়া হয়। তবে তার বর্তমান অবস্থা এবং কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইসরাইলি কারাগারে আটক ৮৭ ফিলিস্তিনি নারী
ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই নতুন করে নির্যাতনের এসব অভিযোগ সামনে এসেছে।
গত ১২ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি জানায়, ইসরাইলের কারাগারে ৮৭ জন ফিলিস্তিনি নারী আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনকে প্রশাসনিক আটকাদেশের আওতায় রাখা হয়েছে।
প্রশাসনিক আটকাদেশের মাধ্যমে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন কিংবা বিচার ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের আটক রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বন্দি ও তাদের আইনজীবীদের কাছ থেকে গোপন রাখা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ ধরনের আদেশ দেওয়া হয়।
সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, নারী বন্দিদের নির্জন কারাবাস, দুর্ব্যবহার, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি অব্যাহত রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে খোসপাঁচড়ার মতো চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে কিংবা শারীরিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা বন্দিদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
প্রায় ৫০ দিন ধরে নির্জন কারাবাসে নারী সাংবাদিক
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক বুশরা আল-তাওয়িলের আটকাবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ৩৩ বছর বয়সী এই সাংবাদিক প্রায় ৫০ দিন ধরে নির্জন কারাবাসে রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি।
সংগঠনটির অভিযোগ, এ সময়ে তিনি একাধিকবার মারধর, পিপার স্প্রে দিয়ে হামলা এবং অবমাননাকর আচরণের শিকার হয়েছেন।
গত ১২ অক্টোবর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তার প্রশাসনিক আটকাদেশ আরও চার মাসের জন্য নবায়ন করে। ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ কিংবা বিচার ছাড়াই তার আটকাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়েছে।
ফিলিস্তিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটির ভাষ্য, বুশরাকে এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে বারবার স্থানান্তর করায় আইনজীবীদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্বাস্থ্য ও আটকাবস্থার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার নির্জন কারাবাস বন্ধ, যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত এবং মুক্তির দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
নারী বন্দিদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান
ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের সুরক্ষায় অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস।
সংগঠনটি বন্দিদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক নির্জন কারাবাস, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারী তল্লাশি এবং কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহারের অবসান দাবি করেছে।
একই সঙ্গে আহত, অন্তঃসত্ত্বা, বয়স্ক ও অসুস্থ বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারাগারের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হয়। নির্যাতনসহ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ থেকেও তাদের সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের ওপর নির্যাতনের এসব অভিযোগ ইসরাইলি কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে জবাবদিহি ও স্বাধীন তদন্তের দাবি আরও জোরালো করেছে। বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, আটক নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।