মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুমুল বিরোধীতা সত্ত্বেও প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা আবদুল এল-সায়েদ মিশিগানের বহুল আলোচিত একটি সিনেট আসনে জয় পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আগামী জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন।
৮০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে নিজের বিজয় ঘোষণা করেন এল-সায়েদ। গণনা হওয়া ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স পেয়েছেন ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। ফলে বেশ ভালো ব্যবধানেই এগিয়ে রয়েছেন এল-সায়েদ।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ২টা ২৭ মিনিটে (জিএমটি ৭টা ২৭ মিনিট) তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
বিজয়ের পর উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে দেওয়া ভাষণে সায়েদ বলেন, ‘আপনাদের নির্বাচিত সিনেটর হিসেবে এখানে দাঁড়াতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সম্মানিত।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের করা ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য ও কটূক্তি মোকাবিলা করেই তাঁকে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে।
উল্লাস ও করতালির মধ্যে তিনি বলেন, ‘যেসব বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের বোঝাতে হিমশিম খাচ্ছেন যে, রাষ্ট্রপতি কেন প্রকাশ্যে কারও নাম বা প্রার্থনার পদ্ধতি নিয়ে উপহাস করেছেন, আগামীকাল তাঁদের জানিয়ে দেবেন যে, খারাপ লোকেরা হেরে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা এমন এক আমেরিকা চায়, যেখানে আমাদের কয়েকজনের জন্য জায়গা খুবই সংকীর্ণ হবে। কিন্তু আমরা জানি, আমেরিকা আমাদের সবার জন্যই যথেষ্ট বড়।’
সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ও করতালির জবাবে বক্তব্য দিতে গিয়ে সায়েদ বিশেষভাবে জেডি ভ্যান্স ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেন।
ভ্যান্সকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘জেডি, হাবিবি, এর মধ্যে একটা চমৎকার পরিহাস আছে যে, জানুয়ারিতে আমাকে শপথবাক্য পাঠ করানোর জন্য তুমি সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।’
ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড, আমি জানি আমার নামটা নিয়ে আপনার সমস্যা হয়। তাই জানুয়ারিতে জেডি আমাকে শপথবাক্য পাঠ করানোর পর আপনি আমাকে সিনেটর বলেই ডাকতে পারেন।’
সায়েদের এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
প্রগতিশীল রাজনীতির নেতা সায়েদ গত আগস্টে অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে (প্রাইমারি) ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন পাওয়া হ্যালি স্টিভেন্সকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের বিস্মিত করেছিলেন। ওই জয়ের পর থেকেই সিনেটে প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ভারমন্টের বার্নি স্যান্ডার্সের সমর্থন পান তিনি।
সায়েদ বিশেষভাবে আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) এবং অন্যান্য ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে পড়েন। এসব গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে।
আইপ্যাকের ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে সায়েদ বলেন, ‘আইপ্যাক আমাদের বিরুদ্ধে ৪২ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। আমাকে তোমাদের দুবার হারানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে ফিলিস্তিনি শিশুরা আমাদের করের টাকায় খুন না হয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে, তাহলে তারা আপনাকে বিদ্বেষী বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে।’
তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যদি শান্তি, মর্যাদা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সমান অধিকারে বিশ্বাস করেন, তবে তা ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসা।’
মার্কিন করের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে সায়েদ বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের করের টাকা এখানেই খরচ হোক। আমরা চাই না আমাদের টাকা বর্ণবৈষম্য বা গণহত্যায় পাঠানো হোক।’
মিশিগান ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কার্টিস হার্টেল এর আগে বলেছিলেন, এই নির্বাচনী লড়াইয়ের গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, আগের প্রাইমারি নির্বাচনগুলোর তুলনায় পাঁচ লাখ বেশি ডেমোক্রেটিক ভোটার ভোট দিতে কেন্দ্রে এসেছিলেন। সাধারণত এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমর্থনও পান সায়েদ। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে ওবামা অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।
কে এই আব্দুল এল-সায়েদ?
৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের পুরো নাম আব্দুলরহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ। তিনি একজন ভারতীয়-আমেরিকান চিকিৎসককে বিয়ে করেছেন। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।
২০০৭ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছিলেন সায়েদ। ওই অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সায়েদের বক্তব্য শুনে মঞ্চে দাঁড়িয়েই তাঁর বাগ্মিতার প্রশংসা করেছিলেন ক্লিনটন।
এরপর মিশিগানের এই বাসিন্দা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ডেট্রয়েট ও ওয়েন কাউন্টির জনস্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দেন। এরপর ২০২৫ সালে তিনি মার্কিন সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। শুরুতে তাঁর এই নির্বাচনী লড়াইয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হয়েছিল।
তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে এটাই তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল না।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন সায়েদ। তবে ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ পরিকল্পনার পক্ষে জনমত তৈরির ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে সবার জন্য একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করা।
এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়ামের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে সায়েদের প্রস্তাবিত নীতিটি রাজনৈতিক বাম ও ডান—উভয় পক্ষের কাছেই ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সায়েদের সমালোচনাও ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর অবস্থানের সঙ্গে নিউইয়র্ক সিটির অত্যন্ত জনপ্রিয় মেয়র জোহরান মামদানির দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট মিল রয়েছে।
সায়েদ বারবার বলেছেন, তিনি কখনো করপোরেট লবিস্টদের সঙ্গে বৈঠক করেননি। তাঁর দুটি নির্বাচনী প্রচারণাতেই করপোরেশনের কাছ থেকে নয়, বরং শুধু ব্যক্তিগত দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা
তবে মামদানির সঙ্গে তাঁর একটি পার্থক্য রয়েছে। মামদানি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থন পেলেও সায়েদ তা পাননি। কারণ, মিশিগানের মতো রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত একটি দোদুল্যমান রাজ্যে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যপন্থী অংশের সমর্থনও পেতে চেয়েছিলেন।
রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় অবস্থান যা-ই হোক না কেন, যত বেশি সম্ভব মার্কিন নাগরিকের কাছে পৌঁছানোই ছিল তাঁর প্রচারণার অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, পডকাস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্টে নিয়মিত হাজির হতেন তিনি। সায়েদ প্রায়ই বলতেন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে দেশের সর্বাধিকসংখ্যক মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিতে চান।
তবে প্রচারণার সময় গণমাধ্যমের নজরদারি ও অনুসন্ধানের মুখে তাঁকে অস্বাভাবিক রকমের কঠোর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এর ফলে অনেকটা অনিচ্ছাকৃতভাবেই তিনি নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের তুলনায় ভোটারদের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন। এমনকি ভোটারদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও রজার্সের চেয়ে বেশি হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে রজার্সকে গণমাধ্যমের এতটা কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে হয়নি। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে সেই সময় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ছিল সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বারবার সায়েদকে ‘একজন কমিউনিস্ট অপদার্থ, যে ইহুদি ও ইসরায়েলকে ঘৃণা করে’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সায়েদকে তিনি শুধু ‘মোহাম্মদ’ বলেই ডাকবেন। ট্রাম্পের দাবি, অধিকাংশ মুসলমানকে এই নামেই ডাকা হয়।
এদিকে রিপাবলিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি সায়েদের আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাঁর সৎ বোনের একসময়কার একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে তারা।
তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সায়েদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। সংগঠনটির কোনো একক কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরও নেই। গত বছর ট্রাম্প এর তিনটি রাজনৈতিক শাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগে যুক্তরাষ্ট্রে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও ঘোষণা করা হয়নি।
গত আগস্টে সায়েদ বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহারের মতো তাদের হাতে কার্যত আর কোনো অস্ত্র নেই; তাঁর নাম ও পরিচয়কে কেন্দ্র করেই তারা আক্রমণ চালাচ্ছে।
রিপাবলিকানদের এসব আক্রমণের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভাবুন তো, উনি তো অন্যরকম।’
এরপর তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এইটুকুই তোমাদের সেরাটা? তোমরা আসলে কী করতে চাও, সেটাও কি বলতে পারো না? আমার নামের কারণে তোমাদের গ্যাসের দাম বাড়ছে না। আমার নামের কারণে আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছি না। তোমরা বাজার করতে পারছ না, তার কারণও আমার নাম নয়।’
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই