যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র তিন দিনে চারটি রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। শেষ সমাবেশের একপর্যায়ে ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীর কাছে এমন একটি প্রশ্ন করেন, যা বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁকে ভাবিয়ে তুলছিল। প্রশ্নটি ছিল—রিপাবলিকান পার্টির অবস্থা এতটা খারাপ হলো কীভাবে?
সময়টা ছিল অক্টোবরের মাঝামাঝি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে দেশজুড়ে কয়েক ডজন নির্বাচনী আসনে রিপাবলিকানদের জনসমর্থন দ্রুত কমছিল। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো দলটির জন্য প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। এমনকি অপ্রত্যাশিতভাবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প তখন মাসব্যাপী রাজনৈতিক উদ্ধার অভিযানে নামেন। উদাসীন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান তিনি। অথচ মাত্র দুই বছর আগেও এসব কট্টর রিপাবলিকান-সমর্থিত আসনে সহজেই জয় পেয়েছিলেন।
ট্রাম্পের ওই ব্যক্তিগত কথোপকথন সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি বলেন, ‘এটা প্রচুর ভ্রমণের ধকল। আর তিনি বারবার যে প্রশ্নটি করছেন, সেটি হলো, ‘আমরা এখানে এসে পৌঁছালাম কীভাবে?’ ’
ট্রাম্পের এই বিলম্বিত উপলব্ধি রিপাবলিকান পার্টির সংকটের গভীরতাই তুলে ধরে। অথচ তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতা ও সহযোগীরা কয়েক মাস ধরেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছিলেন।
ঐতিহাসিক প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ঘুরে দাঁড়ানো ডেমোক্রেটিক পার্টির মোকাবিলায় আগে থেকেই চাপে ছিল রিপাবলিকানরা। এর মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির পরিকল্পনা ছাড়াই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ নতুন করে তীব্র হয়। নিজের তৈরি এসব সংকট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনে। ক্ষুব্ধ ও হতাশ ভোটারদের মুখোমুখি হয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীরা নিজেদের নেতার ক্রমাবনতিশীল জনপ্রিয়তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
নির্বাচনের আগে টেক্সাসভিত্তিক এক হতাশ রিপাবলিকান নির্বাচনী কৌশলবিদ বলেছিলেন, ‘মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ। আর ট্রাম্প এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সাহায্যই করেননি।’
শেষ পর্যন্ত এর জন্য রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে। হতাশ ভোটারদের রায়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে এই নির্বাচনী ধাক্কা।
মঙ্গলবার রাত নাগাদ প্রতিনিধি পরিষদে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে রিপাবলিকানরা। এমন কয়েকটি আসনেও দলটির প্রার্থীরা হেরে যান, যেখানে মাত্র দুই বছর আগে ট্রাম্প ১০ শতাংশের বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির দুটি সূত্রের ধারণা, এই বড় জয়ের ফলে প্রতিনিধি পরিষদে তাদের আসনসংখ্যা ২৪০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও এমন ফলাফল কল্পনা করা কঠিন ছিল।
সিনেটের পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য আরও বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দলটির জন্য ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত কয়েকটি আসন রক্ষা করাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কানসাস, আইওয়া ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো নির্ভরযোগ্য ঘাঁটিতে পরাজয়ের কারণে সিনেটের নিয়ন্ত্রণও ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যায়।
এই ফলাফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষমতার শেষ দুই বছর তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের একের পর এক তদন্ত ও রাজনৈতিক বিরোধিতা তাঁর প্রশাসনের কর্মসূচিকে কার্যত অচল করে দেওয়ার হুমকি তৈরি করবে।
অন্যদিকে, পুরো রিপাবলিকান পার্টি হঠাৎ করেই দিশাহীন হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের ফল আসার আগেই দলের ভেতরে দোষারোপ এবং ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মসমালোচনা শুরু হয়েছিল। ফল খারাপ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় রিপাবলিকান কর্মকর্তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়েও খারাপ ফল আসায় দলটির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আরও বাড়তে পারে।
ট্রাম্পের এক ডজনের বেশি সহযোগী ও উপদেষ্টা, দলীয় কর্মকর্তা এবং নির্বাচনী প্রচারকর্মীর সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, গত এক বছরে দলটি বেশ কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে ভুল করেছে। এর মধ্যে ছিল অতিরিক্ত আশাবাদী নির্বাচনী কৌশল, বারবার অবস্থান বদলানো প্রচারবার্তা এবং কয়েকজন দুর্বল প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া।
তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে—রিপাবলিকানরা মূলত ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারেনি। যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ছয় মাস ধরে এর অর্থনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করা, পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গড়ার প্রকল্পে ব্যস্ত থাকা—এসব কারণে ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটে ভাঙন ধরেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই হোক, বিপুলসংখ্যক মার্কিন নাগরিকের কাছে এসব পদক্ষেপ গভীরভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
অ্যারিজোনার রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ ব্যারেট মারসন বলেন, ‘সত্যি বলতে, এর জন্য দায়ী করার মতো একজনই আছেন। যুদ্ধটি না হলে পুরো নির্বাচনী পরিস্থিতিই সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। আর সেই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন একজনই।’
তবে মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করার যেকোনো ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি, প্রার্থীদের নিজেদের ব্যর্থতার কারণেই এই পরাজয় হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যালটে থাকা অনেক প্রার্থীর পক্ষে যতটা প্রচার করেছেন, প্রার্থীরা নিজেদের পক্ষে ততটা প্রচারও করেননি।”
অনিশ্চিত ও খামখেয়ালি ট্রাম্প
এখন হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে পরাজয়কে অনিবার্য হিসেবে তুলে ধরা এবং ট্রাম্পের ভূমিকা থেকে একে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা গত বছরের অবস্থানের তুলনায় বড় পরিবর্তন। গত বছর এই সময়ে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা ইতিহাসের প্রচলিত ধারা ভেঙে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস পরিকল্পনাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টকে কার্যত ‘ব্যালটে’ রাখা হবে।
তখন রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বৈচিত্র্যময় ও আপাতদৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী মাগা ভোটার জোটের ওপর আস্থা রাখছিলেন। ‘দ্য বিগ বিউটিফুল বিল’ নামে পরিচিত বিশাল করছাড় ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত প্যাকেজ পাস হওয়ায় তাঁরা আরও আশাবাদী হয়ে ওঠেন। অর্থনীতিও তখন তুলনামূলক স্থিতিশীল মনে হচ্ছিল এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমছিল। ফলে বাইডেন আমলের উচ্চমূল্যের পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে ভোটারদের কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
রিপাবলিকানদের হাতে আরও একটি কৌশল ছিল। ট্রাম্পের শীর্ষ রাজনৈতিক সহযোগী জেমস ব্লেয়ারের পরিকল্পনায় নজিরবিহীনভাবে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আগেভাগেই কংগ্রেসের এক ডজনের বেশি আসনের সীমানা রিপাবলিকানদের অনুকূলে পরিবর্তন করা এবং নভেম্বরে দলটিকে যেসব আসন রক্ষা করতে হতে পারে, সেগুলোর সংখ্যা কমিয়ে আনা।
ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া কয়েকটি ব্যক্তিগত বৈঠকে ব্লেয়ার ও ওয়াইলস যে আশাবাদী মধ্যবর্তী নির্বাচনী কৌশল তুলে ধরেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের এই সংকুচিত তালিকা। বৈঠকগুলোতে উপস্থিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
তাঁরা রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ও মিত্রদের একটি সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক বার্তা প্রচারের আহ্বান জানান। এতে ট্রাম্পের অর্জন তুলে ধরার পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অগ্রগতি এবং ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের মতো জনপ্রিয় বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
পরিকল্পনা ছিল, শুরুতে অর্জিত সাফল্যের ভিত্তিতে ভোটারদের কাছে আরও দুই বছরের জন্য দায়িত্ব চাওয়া হবে, যাতে সরকার বাকি কাজ শেষ করতে পারে। তাঁরা জোর দিয়ে বলেছিলেন, রিপাবলিকান পার্টিকে একই বার্তায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যদিও তাঁরা স্বীকার করেছিলেন, ট্রাম্প নিজে সম্ভবত সেই শৃঙ্খলা মেনে চলবেন না। এক বৈঠকে ব্লেয়ার বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ‘নিজের মতো করেই চলবেন’।
বাস্তবে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতে যাচ্ছে, তা বোঝাতে ওই বক্তব্য ছিল নিতান্তই কম বলা।
যুদ্ধের বিপর্যয়
এর দুই সপ্তাহও পার হয়নি, ট্রাম্প ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালান। ওই হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ নিহত হয়। হামলার উদ্দেশ্য ছিল দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং প্রেসিডেন্টকে দ্রুত বড় ধরনের বিজয় এনে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা। সামরিক অভিযান ইরানের প্রতিরোধের সংকল্প আরও জোরদার করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে মার্কিন সেনাসদস্যরা নিহত হন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।
যুদ্ধের প্রথম দিকে ট্রাম্প ও তাঁর জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা এর পরিণতি খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত এটি মাত্র চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়েই ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তখন ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘অনেক মানুষই বুঝতে পারছেন না, কেন আমাদের এই কাজটি করতে হলো।’
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা সব প্রস্তুতিকে ‘অকার্যকর’ করে দিয়েছে। ওই উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, ‘প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছালে কী হবে, কে জানে? এটি একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি, এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।’
পরবর্তী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। যুদ্ধ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে এবং ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি আড়ালে পড়ে যায়। প্রেসিডেন্টের অর্জন তুলে ধরতে দেশজুড়ে দীর্ঘ সফরের যে পরিকল্পনা ছিল, তা স্থগিত করা হয়। এমনকি ট্রাম্পের প্রায় ৪০ কোটি ডলারের নির্বাচনী তহবিল কোথায় ও কখন ব্যয় করা হবে, সে ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তও পিছিয়ে দেওয়া হয়।
মিত্রদের মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুদ্ধের সরাসরি সংঘাত। তিনি এত দিন নিজেকে এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে গড়ানোর সময় তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দামও প্রায় ৪ ডলারের কাছাকাছি চলে আসে। তখন ট্রাম্পের এক মিত্র হোয়াইট হাউসের সমালোচনা করে বলেন, ‘তাঁরা নিজেদের মূল সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, তা অবমূল্যায়ন করেছিলেন। এপ্রিলে যদি আমরা এ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন না হই, তাহলে নভেম্বরে আমাদের রাজনৈতিকভাবে শেষ হয়ে যেতে হবে।’
গ্রীষ্মের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ট্রাম্পের বারবার দাবি করা ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বিজয়’ আসলে আসেনি। বরং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পুরো সময়জুড়েই যুদ্ধ একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে থাকবে। জুনে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ায় রিপাবলিকান প্রার্থীরা সংঘাত নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো বার্তা দিতে পারেননি। অথচ অর্থনীতির যেসব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা নির্বাচনী প্রচার চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, সেগুলো একে একে দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়ে আরও বাড়তে থাকে। মুদি পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যায়, যিনি ‘প্রথম দিন থেকেই’ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেই ভোটারদের ক্ষোভ বাড়ছে।
রিপাবলিকান পার্টির কয়েকটি অংশে আইনপ্রণেতা ও তাঁদের উপদেষ্টারা নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ট্রাম্পের কাছ থেকে কতটা এবং কীভাবে দূরত্ব তৈরি করা যায়, তা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে হিসাব-নিকাশ শুরু করেন। কয়েকজন ইতিমধ্যে তাঁর মূল্যবৃদ্ধিকারী শুল্কনীতির সমালোচনা করেছিলেন অথবা যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এসব সমালোচনা ছিল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা। কয়েকটি ক্ষেত্রে সমালোচনার আগে হোয়াইট হাউসকে আগাম জানানো হয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছালেও অধিকাংশ রিপাবলিকান নেতা তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে রাজি হননি। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, গত ১৮ মাস ধরে ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই দেওয়ার পর এখন তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করলে দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা খুব একটা বাড়বে না। বরং মাগা সমর্থকদের কাছে তাঁদের অবস্থান নিশ্চিতভাবেই দুর্বল হয়ে পড়বে।
অন্যরা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্রোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। তাঁদের হিসাব ছিল, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি মেনে নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করাই ভালো। আশা ছিল, ট্রাম্পের সবচেয়ে অনুগত সমর্থকেরাই তাঁদের নির্বাচনী জয় এনে দিতে পারবেন।
নির্বাচনী বার্তা থেকে বিচ্যুতি
হোয়াইট হাউসের ভেতরে শুরুতে রিপাবলিকানদের নীতিগত সাফল্য তুলে ধরা এবং কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য যে বিস্তৃত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা সংকুচিত হয়ে ট্রাম্পের মাগা সমর্থকদের শেষবারের মতো ভোটকেন্দ্রে আনার মরিয়া প্রচেষ্টায় পরিণত হয়।
গত ২১ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে বিদেশি প্রতারণামূলক ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ প্রকল্প এবং সেগুলো প্রতিরোধে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিন এবং অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ।
প্রেসিডেন্ট নিজে অবশ্য নির্বাচনী প্রচারের খুঁটিনাটি পরিকল্পনা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। কখনো কখনো আশপাশের লোকজনকে তিনি বলতেন, নিজের দায়িত্ব তিনি ইতিমধ্যে পালন করেছেন, হোয়াইট হাউসে জিতেছেন। এর পরিবর্তে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প তদারকিতে অস্বাভাবিক রকমের বেশি সময় ব্যয় করছিলেন। এসব প্রকল্পকে তিনি নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। কিন্তু অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের চোখে এগুলো ছিল সময় ও অর্থের অপচয়।
ভোটারদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তোলা বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার সময়ও ট্রাম্প সাধারণত সেগুলো উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি নিয়মিত দাবি করতেন, পেট্রলের দাম শিগগিরই ব্যাপকভাবে কমে যাবে। ইরানের যুদ্ধকে তিনি ‘স্বল্পমেয়াদি কষ্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলতেন, এই মূল্য দেওয়া সার্থক। জনমত জরিপে দুই দলের ভোটারদের মধ্যেই এসব নীতির বিষয়ে গভীর সংশয় দেখা গেলেও তিনি শুল্কনীতির প্রশংসা করতেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতকে নিঃশর্ত সমর্থন দিতেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগ যখন বাড়ছিল, তখন শুরুতে ট্রাম্প সেটিকে ‘প্রতারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এমন মন্তব্যের পর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বক্তব্যটি সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন উপদেষ্টা।
কিন্তু তাঁদের হতাশ করে ট্রাম্প পরবর্তী সময়েও বারবার একই কথা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে বিষয়টি তাঁর নির্বাচনী সমাবেশের নিয়মিত বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে। সেপ্টেম্বরে নর্থ ক্যারোলাইনায় এক সমাবেশে ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন, ‘এটা এমন একটা শব্দ, যেটা তারা নিজেরাই বানিয়েছে। আর এই জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত শব্দটা নিয়ে দেড় বছর ধরে আমাকে আক্রমণ করা হচ্ছে।’
ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীরা
এদিকে ট্রাম্পের সহযোগীরা যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আসনসংখ্যা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, বাস্তবে তা আরও বিস্তৃত হয়ে যায়। এর বড় কারণ ছিল সিনেট নির্বাচনে ট্রাম্পের নিজের বেছে দেওয়া কয়েকজন প্রার্থীর দুর্বলতা।
টেক্সাসে রিপাবলিকান কংগ্রেস নেতাদের আপত্তি উপেক্ষা করে কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত এই প্রার্থীর নির্বাচনী অবস্থান এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, রাজ্যের কয়েকজন নির্বাচনী কৌশলবিদ ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, তিনি আদৌ এই পদটি চান কি না।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইকেল হোয়াটলি নর্থ ক্যারোলাইনায় নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই পিছিয়ে পড়েন। ট্রাম্পের একাধিক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়েও তিনি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।
অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলাইনায় সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের স্থলাভিষিক্ত করতে ট্রাম্প আকস্মিকভাবে তাঁর বোন ডারলেইন গ্রাহামকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর অনভিজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই রাজ্যেই ট্রাম্প ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি সাধারণত নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত আসনে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানের মুখে প্রস্তুতিহীন হয়ে পড়েন। এতে ট্রাম্পের দলের হতাশা আরও বাড়ে।
কানসাসে সিনেটর রজার মার্শালের দুর্বল হয়ে পড়া নির্বাচনী প্রচার সামাল দিতে রিপাবলিকানরা যখন মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তাঁরা নিশ্চিন্তে বসে ছিলেন, যদিও বিপদের লক্ষণগুলো স্পষ্ট ছিল।” কানসাসে প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছিল।
জ্বালানি ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়া ভোটারদের কিছুটা স্বস্তি দিতে হোয়াইট হাউস তখন বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের পথ খুঁজতে থাকে। ট্রাম্প তুলনামূলক সস্তা ধরনের পেট্রল ব্যবহারের সুযোগ সমর্থন করেন। পাশাপাশি ট্রাকচালকদের জন্য করমুক্ত ডিজেল ব্যবহারের পথ খুলে দেন। এই ডিজেল সাধারণত কেবল সড়কের বাইরে ব্যবহৃত যানবাহনের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিতেও অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন ট্রাম্প। নির্বাচনের দিন নাগাদ এসব সহায়তার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এসব উদ্যোগের বেশির ভাগই ভোটারদের মধ্যে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের অন্য অংশের সমর্থন ধরে রাখতে ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপই এসব উদ্যোগের সুফল নষ্ট করে দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল সাময়িকভাবে গরুর মাংস আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। মুদি পণ্যের দাম কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে রিপাবলিকানদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিকান নির্বাচনী কৌশলবিদ বলেন, যুদ্ধটি শুধু নিজের কারণেই অজনপ্রিয় ছিল না, বরং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছিল, যা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি মূল্যস্ফীতির সংকট তৈরি করেছিল, যা সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। এরপর সেখান থেকে আরও হাজারো সমস্যা একের পর এক তৈরি হতে থাকে।’
রাজনৈতিক অঙ্গনে রিপাবলিকানদের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি দলের সবচেয়ে বড় সুবিধাটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। সেটি ছিল ট্রাম্পের সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার প্যাকের প্রায় ৪০ কোটি ডলারের তহবিল। এই অর্থের বড় একটি অংশ এসেছিল ধনী দাতা ও বিভিন্ন করপোরেশনের কাছ থেকে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরেই তাঁর অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় তারা এই অর্থ দিয়েছিল।
কিন্তু কয়েক মাস ধরে ‘মাগা ইনকরপোরেটেড’ (MAGA Inc.) নামের ওই সুপার প্যাক অর্থ ব্যয় করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পেছনে ছিল অন্য প্রার্থীদের সহায়তা করতে নিজের সংগ্রহ করা অর্থ ছাড়তে ট্রাম্পের অনীহা এবং নির্বাচনী পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে থাকায় কোথায় ও কীভাবে অর্থ ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে রিপাবলিকান কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তহীনতা।
দীর্ঘ আলোচনা ও টানাপোড়েনের পর নির্বাচনের আগের দুই মাসে দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের অনুমোদন দেন ট্রাম্প। দলীয় কর্মকর্তাদের মতে, এই অর্থের প্রবাহ রিপাবলিকানদের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল। এতে দলটির প্রধান দুটি সুপার প্যাক দোদুল্যমান আসন এবং নিজেদের দখলে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন আসনগুলোতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ পায়। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ‘মাগা ইনকরপোরেটেড’ মূলত আরও গভীরভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনী লড়াই সামাল দেওয়ার কাজে মনোযোগ দেয়।
তবে এরপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কীভাবে সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে?
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের কেউ কেউ মনে করতেন, রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হবে নির্বাচনী লড়াইকে স্থানীয় ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং ডেমোক্র্যাটদের দিকে ভোটারদের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া। তাঁদের আশা ছিল, ‘সমাজতন্ত্র’কে ক্ষমতায় আনার আশঙ্কা দেখিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানা সম্ভব হবে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তাঁদের তাৎক্ষণিক ক্ষোভ কিছুটা হলেও চাপা পড়বে।
অন্যদিকে, আরেকটি পক্ষের ধারণা ছিল, ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ট্রাম্পকেন্দ্রিক করে তুলেছে। রিপাবলিকানদের তৃণমূল পর্যায়ে উৎসাহের অভাব দেখে তাঁরা মনে করতেন, এখন প্রেসিডেন্টকে পুরোপুরি প্রচারে নামিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর হারানোর কিছু নেই। ট্রাম্পের আরেক মিত্র বলেন, ‘পাল্টা কোনো বার্তাই নেই। কারণ তারা ‘বিগ বিউটিফুল বিল’-এর পক্ষে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, অথচ তাতে কারও বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।’
শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের অবসান ঘটান ট্রাম্প নিজেই।
ঘটনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশজুড়ে বিভিন্ন নির্বাচনী আসনে রিপাবলিকানদের ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে থাকার অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপ দেখে ট্রাম্প ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব নিজেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তাঁর দল দ্রুত নির্বাচনের শেষ মাসের জন্য একটি বিশেষ সফরসূচি তৈরি করে। এর আওতায় প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশজুড়ে ছুটে বেড়িয়ে তিনি নিজের অনুগত সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। যদিও এবার ব্যালটে তাঁর নিজের নাম ছিল না।
মিশিগানের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, এমনভাবে কল্পনা করুন যেন আমিই ব্যালটে আছি। যখন ব্যালটে আমার নাম থাকে না, তখন মানুষ ভোট দিতে আসে না। দয়া করে আসুন এবং ভোট দিন।’
প্রায় প্রতিটি সমাবেশেই একই ধরনের আহ্বান জানান তিনি। কোনো কোনো সময় প্রায় প্রতিদিনের এই ভ্রমণ ট্রাম্পকে উজ্জীবিত করেছিল। জনসমাগম দেখে তিনি আনন্দ পেতেন এবং নিজের সেই পরিচিতি উপভোগ করতেন, যা তাঁর এক উপদেষ্টার ভাষায় ছিল ‘আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভোটার সমাবেশ ঘটানোর যন্ত্র’।
তবে অন্য সময় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিদের মতে, অন্যদের নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে তাঁকে এত কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে, এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন ট্রাম্প।
শীর্ষ রিপাবলিকান নেতারাও এই সফরকে একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও ঝুঁকি হিসেবে দেখছিলেন। তাঁদের আশা ছিল, ট্রাম্পের পরিচিত রাজনৈতিক সমাবেশগুলো ফিরিয়ে এনে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে একই সঙ্গে তাঁরা ট্রাম্পকে কেবল শক্তিশালী রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাগুলোতে সফর করার পরামর্শ দিচ্ছিলেন, যাতে দোদুল্যমান আসনগুলোর নির্বাচনী পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়। নির্বাচনের শেষ কয়েক দিনে রিপাবলিকান কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছিলেন, ট্রাম্পের সমাবেশগুলো ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সাহায্য করছে। যদিও এসব সমাবেশে প্রেসিডেন্টের শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী বার্তা ছিল অসংলগ্ন এবং কখনো কখনো বিস্ময়করভাবে বিভ্রান্তিকর।
এর একটি উদাহরণ দেখা যায় ওহাইওতে। সেখানে কয়েকটি সফরের সময় প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডের ‘নিতম্বের’ আকৃতি নিয়ে বারবার কথা বলেন।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পেছনে ছিল তাঁর বিস্ময় যে, হাস্টেড নির্বাচনী প্রচারে নিজের অতীতকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন না। হাস্টেড তৃতীয় বিভাগে কলেজ ফুটবল খেলেছিলেন। ট্রাম্প মনে করতেন, এই পরিচয়কে নির্বাচনী প্রচারে আরও বেশি কাজে লাগানো উচিত ছিল। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা এমনটাই জানিয়েছেন।
এটি ছিল ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক রসবোধের এক অদ্ভুত উদাহরণ।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে তাঁর কট্টর সমর্থকদের মধ্যে যতই উৎসাহ দেখা যাক না কেন, তা যুদ্ধ এবং উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। এমনকি জনমত জরিপেও রিপাবলিকানদের বিপক্ষে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা ডেমোক্র্যাটদের ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল ঢেউয়ের দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
সফরের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের মেজাজও উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন তাঁর সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরা। নির্বাচনের আর ২৪ ঘণ্টারও কম সময় বাকি থাকতে ট্রাম্প আবারও এমন একটি বিষয়ে ফিরে যান, যেটিকে তিনি প্রায়ই নিজের জন্য ‘স্বস্তিদায়ক’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিষয়টি হলো নির্মাণকাজ।
সোমবার লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের শেষ ভাষণের বড় একটি অংশজুড়ে ট্রাম্প ওই জলাধারের শৈবাল নিয়ে তাঁর লড়াইয়ের বর্ণনা দেন। পাশাপাশি পাইপ মেরামত এবং ঘাস প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে কী কী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন।
রিপাবলিকান কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। তবে নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য এটিই চূড়ান্ত বা নির্ধারক কারণ ছিল না। কারণ, আট মাস আগেই ট্রাম্প তাঁর দলকে এই পরিণতির পথে ঠেলে দিয়েছিলেন। এখন আর কিছু করার ছিল না। কেবল সামনে আসন্ন রাজনৈতিক আঘাতের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া।