রবিবার, 25 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সংবিধান সংশোধন কমিটির মতবিনিময়: তত্ত্বাবধায়ক প্রধান হিসেবে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব

নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ও কার্যপরিধি নিয়ে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা নানাবিধ ধারণা দিয়েছেন। সংসদের উচ্চকক্ষে একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ তৈরি করে তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার যেমন প্রস্তাব এসেছে, তেমনি সব দলের ঐকমত্যে স্পিকার কিংবা উচ্চকক্ষ থেকে অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগের বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছে।

সংবিধান সংশোধন কমিটির মতবিনিময়: তত্ত্বাবধায়ক প্রধান হিসেবে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব
আগামী নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব সংসদের উচ্চকক্ষের কোনো প্রতিনিধির হাতে অর্পণের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ সংসদীয় কমিটি।

একই সঙ্গে নিম্নকক্ষ ভেঙে যাওয়ার পরও উচ্চকক্ষ বহাল থাকলে সেখান থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রধান ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের বেছে নেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। এর বাইরে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচিত স্পিকারকে এই পদে বসানোর আরেকটি বিকল্প ভাবনাও উঠে এসেছে। আজ শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে আয়োজিত কমিটির নবম বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের কাছে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশেষ এই সংসদীয় পর্ষদের সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সকাল এগারোটা থেকে শুরু হয়ে মাঝে এক ঘণ্টার বিরতিসহ বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চলা এই দীর্ঘ মতবিনিময় সভায় দেশের প্রথিতযশা আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীরা অংশগ্রহণ করেন।

বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ও কার্যপরিধি নিয়ে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা নানাবিধ ধারণা দিয়েছেন। সংসদের উচ্চকক্ষে একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ তৈরি করে তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার যেমন প্রস্তাব এসেছে, তেমনি সব দলের ঐকমত্যে স্পিকার কিংবা উচ্চকক্ষ থেকে অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগের বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত কাঠামো জমা পড়েনি বিধায় সবাইকে নিজেদের মতামত লিখিত আকারে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি। এছাড়াও বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটির ওপর নির্ভর না করে কীভাবে সর্বসম্মতভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন দাঁড় করানো যায়, সেটি নিয়ে তাত্ত্বিক পর্যালোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, শাসন ও আইন বিভাগের ওপর বিচারিক পর্যালোচনার পরিধি এবং সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও কাঠামোগত সংস্কারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা, নিম্নকক্ষের মেয়াদকাল চার বছর ও উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর নির্ধারণ করা এবং দেশের ৬৪টি জেলা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের সমন্বয়ে উচ্চকক্ষ গঠন করা। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক কাঠামোর মর্যাদা দেওয়া এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের আওতা সম্প্রসারণের বিষয়েও তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের ক্ষেত্রে অর্থবিল, আস্থাভোট, সংবিধান সংশোধন এবং যুদ্ধকালীন বা জাতীয় নিরাপত্তার মতো চারটি নির্দিষ্ট বিষয় বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংসদীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে সরকারি হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর নেতৃত্ব বিরোধী দলের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সেই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন, ৭৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধি, সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন বাছাই কমিটি গঠন এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের হাতে ন্যস্ত করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে, উচ্চকক্ষের আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কি না, তা নিয়ে কয়েকজন সন্দেহ প্রকাশ করে এর পরিবর্তে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পক্ষে মত দেন। এছাড়া আদালতের কোনো রায়ের কারণে সংবিধান নিজে থেকেই সংশোধিত হয়ে যাবে কি না, এমন বিতর্কে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই মত দিয়েছেন যে, আদালতের রায়কে কার্যকর করতে হলে সংসদকেই সংশোধনীর মাধ্যমে তা সংবিধানে যুক্ত করতে হবে।

আলোচনাকালে বিশেষজ্ঞরা নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোর ওপর জোর দেন। কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাদের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার কথা জানানো হয়। জুলাইয়ের জাতীয় সনদে বিএনপির থাকা আপত্তির প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; তবে বিরোধী দলগুলো আলোচনায় অংশ নিয়ে কোনো বিষয়ে ছাড় চাইলে সেটি বিবেচনা করা হতে পারে। বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের সরকারি প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত অধ্যাদেশে ত্রুটি থাকায় সেটি আর আইনে রূপ পায়নি। ২০১১ সালের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কমিটির মতো এবারও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ ভেস্তে যাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, তৎকালীন সরকারের একদলীয় শাসন ও অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার মানসিকতার সঙ্গে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রেক্ষাপট মেলানো একেবারেই সমীচীন হবে না।

সভা শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলও বিরোধী মতকে প্রাধান্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান। এ দিনের দীর্ঘ মতবিনিময় সভায় আরও অংশ নেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান, সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান এবং ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওনসহ আরও অনেকে।