দেশ ও দেশের বাইরে তৎপর মানব পাচারকারী গোষ্ঠীগুলোকে শক্ত হাতে দমনের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় আনতে স্থানীয় প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন তিনি। শনিবার বিকেল পাঁচটার দিকে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে মানব পাচারকারীদের গুলিতে প্রাণ হারানো সেনাসদস্য তিতাস শেখের পৈতৃক নিবাসে উপস্থিত হয়ে তিনি এই নির্দেশনার কথা জানান। সেখানে তিনি শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং নিহতের কবর জিয়ারত করে তার আত্মার শান্তি কামনা করেন।
নিহত সেনাসদস্যকে অত্যন্ত দক্ষ ও নির্ভীক আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাচারকারীদের নির্মম বুলেটে তাকে আত্মোৎসর্গ করতে হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এরা দেশ ও দশের চরম শত্রু, তাই যেকোনো উপায়ে এদের প্রতিহত করা সময়ের দাবি। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে মানব পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পাচারকারী চক্রের জাল কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত। তাই যে সমস্ত রুট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিদেশে পাচারের অপচেষ্টা চালানো হয়, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে যেন অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি করা যায়।
মানব পাচার রোধে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি আরও জানান, সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরসহ মোট চৌদ্দটি জেলার জেলা প্রশাসকদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত সভায় তৃণমূল পর্যায় অর্থাৎ ওয়ার্ড থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত দালাল চক্রের অপতৎপরতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এসব চক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তারের তাগিদ দেন তিনি। এছাড়া প্রবাসে নিখোঁজ, বন্দি কিংবা জিম্মি অবস্থায় থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও দুই মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
বিগত সতেরো বছর ধরে মাদক ব্যবসায়ী ও সংঘবদ্ধ মাফিয়ারা মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই অপরাধ দমনে অত্যন্ত তৎপর এবং উভয় মন্ত্রণালয় এ নিয়ে একযোগে কাজ করছে। মানব পাচারকারীদের কারণে একদিকে যেমন দেশপ্রেমিক সৈনিকদের অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণেই দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত সকল মানব পাচারকারীকে রুখে দিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মন্ত্রীর এই পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাসুল সামদানী আযাদ, নিহত তিতাসের মামা এবং লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
প্রসঙ্গক্রমে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফে অবস্থিত দুর্গম পাহাড়ে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় মানব পাচারকারীদের অতর্কিত গুলিতে আটাশ বছর বয়সী সেনাসদস্য তিতাস শেখ শাহাদাতবরণ করেন। তিনি লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের সন্তান এবং তিন ভাই-বোনের মাঝে দ্বিতীয় ছিলেন। সতেরো সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেওয়া তিতাস টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে ১ বীর ইউনিটের অধীনে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে শুক্রবার সেনাবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টার যোগে তার মরদেহ নিজ গ্রামে নিয়ে আসা হয় এবং স্থানীয় আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে নানির কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।