শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

জার্মানিতে এএফডির উত্থান: কেন নাৎসি অতীতের ছায়া দেখছে পুরো ইউরোপ?

বিজয়ী দলের উদযাপন মঞ্চের পেছনে বড় অক্ষরে লেখা ছিল জার্মান ভাষার একটি বাক্য—‘আলেস ইস্ট ম্যোগলিখ’। অর্থাৎ, ‘সবকিছুই সম্ভব’। অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডির সাফল্য যেন সেই বার্তাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যের বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে এএফডি।

জার্মানিতে এএফডির উত্থান: কেন নাৎসি অতীতের ছায়া দেখছে পুরো ইউরোপ?
গর্বিত এএফডির তিন নেতা। ছবি: রয়টার্স

বিজয়ী দলের উদযাপন মঞ্চের পেছনে বড় অক্ষরে লেখা ছিল জার্মান ভাষার একটি বাক্য—‘আলেস ইস্ট ম্যোগলিখ’। অর্থাৎ, ‘সবকিছুই সম্ভব’। অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডির সাফল্য যেন সেই বার্তাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যের বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে এএফডি।

জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে আয়তনে অষ্টম এবং জনসংখ্যার বিচারে ১১তম স্যাক্সনি-আনহাল্ট। সেখানে কট্টর জাতীয়তাবাদী দলটির নির্বাচনী সাফল্য ঘিরে শুধু জার্মানিতেই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। দুই বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস বহন করা শিল্পোন্নত এই মহাদেশে এএফডির উত্থানকে অনেকেই দেখছেন ‘হিটলারের ছায়া’ ফিরে আসার আশঙ্কার সঙ্গে মিলিয়ে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় দল হয়েছে এএফডি। দলটির রাজ্যপ্রধান প্রার্থী এবং নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য উলরিশ সিগমুন্ড বিজয়ী ভাষণে বলেন, তারা ইতিহাস তৈরি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা আবার নিজেদের দেশ দখলে নেবেন এবং সেই যাত্রার সূচনা হচ্ছে স্যাক্সনি-আনহাল্ট থেকে।

হিটলারের নাৎসি পার্টি 

১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি, যা নাৎসি পার্টি নামে পরিচিত, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জার্মানির ক্ষমতায় আসে। জার্মান জাত্যভিমানকে উসকে দেওয়া দলটি ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দেশটিতে একদলীয় শাসন বজায় রাখে। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক আগ্রাসন চালায় তারা।


নাৎসি পার্টির গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯১৯ সালে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি হিসেবে। ওই বছরই হিটলার দলটির একটি সভায় অংশ নেন। পরের বছর দলটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি।

সমাজবাদী ধারণা সামনে রেখে শ্রমিক শ্রেণির সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিল দলটি। পরে হিটলার তার জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে দলের ভেতরে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সে সময় দলের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীও গড়ে তোলা হয়।

১৯২১ সালে দলের অন্য নেতাদের সরিয়ে হিটলার দলটির নেতৃত্ব নিজের হাতে নেন।

এরপর ১৯২৩ সালে জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বাভারিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে নাৎসি পার্টি। সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে দলটিকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২৪ সালে হিটলার কারাগারেও ছিলেন।

নাৎসিবাদ ঠেকাতে যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের উদ্যোগ

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর কাছে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানির পরাজয়ের পর ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রেক্ষাপটে ন্যাটো সামরিক জোট গঠিত হয়।

ন্যাটোর ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ন্যাটোর রাজনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে এগিয়ে নেওয়া। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব মতামত নিয়ে আলোচনা, তথ্য বিনিময়, পারস্পরিক আস্থা তৈরি, সমস্যা সমাধান এবং সংঘাত প্রতিরোধও এর উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে।

ভয় জাগাচ্ছে এএফডির উত্থান

স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিবিসির একটি ভিডিও প্রতিবেদনে রাজ্যটির একটি এএফডি সমাবেশের দৃশ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে এক সমর্থকের গায়ে ‘আরিখ’ লেখা টি-শার্ট দেখা যায়।


জার্মান ভাষায় ‘আরিখ’ শব্দের অর্থ ‘আর্য’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নাৎসিরা নিজেদের ‘সেরা জাতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মিথ্যা ধারণা প্রচারে এই শব্দ ব্যবহার করত।

গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের একটি সংবাদ বিশ্লেষণের শিরোনামেও স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলকে ইউরোপের জন্য অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সেখানে বলা হয়, জার্মানির তুলনামূলক ছোট একটি রাজ্যে অতি-ডানপন্থী দলের নির্বাচনী বিজয়ের প্রভাব লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট থেকে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদ পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এএফডির অভিবাসনবিরোধী অবস্থান স্পেন, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উগ্রবাদী দলগুলোকেও উৎসাহিত করছে।


তাহলে এএফডিকে ঘিরে ইউরোপে এত উদ্বেগ কেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে নানা তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজধানী মাগদেবুর্গের বাসিন্দাদের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।

নাৎসি অতীতের স্মৃতি নিয়ে উদ্বেগ

মাগদেবুর্গের বিভিন্ন বয়সী মানুষের মতামত তুলে ধরা ওই প্রতিবেদনে ৮৮ বছর বয়সী জুডিথ তার শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি জানান, ১৯৪৬ সালে মাত্র ৮ বছর বয়সে তাকে জোর করে পোল্যান্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি মাগদেবুর্গে এসে বসবাস শুরু করেন।

এই অভিজ্ঞতা তার জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল বলে জানান এই প্রবীণ প্রকৌশলী ও রাজনীতিক। স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী এএফডির ভালো ফলকে তিনি ‘হৃদয়বিদারক’ বলে মন্তব্য করেন।

একই এলাকার ৭১ বছর বয়সী ফ্রানজ-ইয়োসেফ বলেন, জার্মানির নাৎসি ইতিহাসের দিকে তাকালে এএফডির এই বিজয়কে তার কাছে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে মনে হয়।

তবে ৩৪ বছর বয়সী লুইসার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তার মতে, এএফডির বিজয় জার্মানির ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি ‘কঠোর বার্তা’। কারণ তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।

তবে এএফডি ক্ষমতায় এলেই জার্মানির অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান হবে, এমনটিও মনে করেন না লুইসা।

এএফডির ইশতেহারে কী আছে

এএফডির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয় হলো জার্মানি থেকে ‘অনিবন্ধিত অভিবাসীদের’ বের করে দেওয়া।


গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের ‘দ্য এএফডি’স ডার্ক এজেন্ডা ফর জার্মানি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, দলটির ২৫৮ পৃষ্ঠার ইশতেহারে ‘সবার আগে দেশ’কে লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যারা দেখতে ‘জার্মান’ নন কিংবা ‘জার্মানদের মতো’ কথা বলেন না, তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও সেখানে রয়েছে।

এমনকি বহু বছর ধরে জার্মানিতে বসবাস করা ব্যক্তিরাও এই তালিকার আওতায় পড়তে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইতিহাস শিক্ষার ক্ষেত্রেও এএফডির অবস্থান আলাদা। দলটি জার্মানির ইতিহাস পাঠে ‘বিসমার্ককে বেশি এবং হিটলারকে কম গুরুত্ব’ দেওয়ার কথা বলেছে। একই সঙ্গে জার্মান সাম্রাজ্যের সাফল্য ও রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তারা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে নাৎসিবাদ এবং হলোকাস্ট বা ইহুদিনিধন নিয়ে যে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়, সেটিও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।


জার্মান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক ১৮১৫ থেকে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইউরোপের ইতিহাসে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন বহু ভাগে বিভক্ত জার্মান জাতিকে একত্র করার কারণে। অনেকেই তাকে জার্মান জাতির ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে সম্মান করেন। তার নেতৃত্বে একীভূত জার্মানি ইউরোপের একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এএফডি তাই বিসমার্কের পথ অনুসরণ করে জার্মানিকে আবারও ‘শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রে’ পরিণত করার লক্ষ্য তুলে ধরছে।

অভিবাসন, শরণার্থী ও অর্থনীতি নিয়ে এএফডির পরিকল্পনা

গত ৭ সেপ্টেম্বর সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এএফডি ‘অভিবাসীদের গণহারে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দলটি শরণার্থীদের জন্য আলাদা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও করছে। জার্মানদের ‘দেশপ্রেমী’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এএফডি। জার্মানির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করানোর পাশাপাশি রাশিয়া থেকে কম দামে জ্বালানি আমদানি এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি।

বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, এএফডির উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও জার্মানির একটি অংশের ভোটারদের আকৃষ্ট করছে।

গত ৭ আগস্ট প্রকাশিত ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক এক জরিপে জার্মানির অন্তত ২৮ শতাংশ ভোটার এএফডিকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এর পরের অবস্থানে রয়েছে দেশটির চ্যান্সেলর বা সরকারপ্রধান ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউ এবং এর সহযোগী দল দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বেভারিয়া অঞ্চলের ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন বা সিএসইউ। এই দুই দলকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন ২১ শতাংশ ভোটার।

সিএনএনের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জার্মানির সংস্কৃতিমন্ত্রী ভলফ্রাম ভেইমার বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, ‘ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এএফডি এমন শব্দ ব্যবহার করছে যা ১০০ বছর আগে নাৎসিরা ব্যবহার করতো।’

নাৎসিবাদ আসলে কী, আর নাৎসিরাই বা কারা?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছর ১৯৪৫ সালে জার্মানিতে নাৎসিদের পতনের ৮১ বছর পর আবারও ‘নাৎসি’ শব্দটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় ফিরে এসেছে। বিশেষ করে স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির বিজয়ের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ দুটোই বেড়েছে। ইউরোপের এই আশঙ্কা এখন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলও লক্ষ্য করছে।


ব্রিটানিকার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানিতে নাৎসি পার্টির একদলীয় শাসনব্যবস্থাই নাৎসিবাদ। এর সঙ্গে ইতালির ফ্যাসিবাদেরও মিল রয়েছে।

ব্রিটানিকা নাৎসিবাদকে মুক্তচিন্তাবিরোধী একটি মতাদর্শ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এখানে স্বৈরশাসকের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তাকে জনগণের সব প্রেরণার একমাত্র উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


নাৎসি পার্টির অন্যতম লক্ষ্য ছিল আর্য জাতির সব শত্রুকে নির্মূল করার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।

ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, নাৎসিবাদ একটি উগ্র মতাদর্শ, যেখানে যুক্তি, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শান্তির মতো ইতিবাচক মূল্যবোধকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

‘সব মানুষ সমান’—এই ধারণাও নাৎসিবাদের অনুসারীরা গ্রহণ করে না। তাদের বিশ্বাস, আর্য জাতিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি এবং কেবল পূর্ণাঙ্গ আর্যদেরই প্রকৃত জার্মান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তবে নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দেওয়া আরও কয়েকটি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের মধ্যে ইরান ও আয়ারল্যান্ড বিশেষভাবে পরিচিত। এই দুই দেশের নামও এরিয়ান বা আর্য শব্দ থেকে উদ্ভূত।

এ কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নিজেদের আর্য হিসেবে দাবি করার অধিকার শুধু জার্মানদের নয়। যদিও হিটলার ‘আর্য’ শব্দটি জার্মানদের বোঝাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন।

নাৎসি মতাদর্শের এই ধারণা থেকেই জার্মানরা নিজেদের ‘সেরা জাতি’ মনে করে অন্য দেশ শাসনের অধিকার নিজেদের আছে বলে বিশ্বাস করত।

জার্মানিতে বর্তমানে জনপ্রিয়তা পাওয়া এএফডির নেতা ও সমর্থকদের মধ্যেও এমন কিছু চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ দলটিকে ‘নব্য-নাৎসি’ হিসেবেও অভিহিত করছেন।

জার্মান রাজনীতিতে এএফডির বিরুদ্ধে ‘অগ্নিবলয়’

গত ১৭ আগস্ট প্রকাশিত ডয়েচে ভেলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, জার্মানিতে এএফডিকে উগ্র ডানপন্থী, জনতুষ্টিবাদী কিংবা চরমপন্থী দল হিসেবে দেখা হয়।

অনেকের মতে, এএফডি একটি ‘উগ্র ডানপন্থী চরমপন্থী দল’। সাধারণভাবে উগ্র ডানপন্থী দলগুলো উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা উদার ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার বিরোধিতা করে।

তবে জার্মানির ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপলাইড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সায়েন্সেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরমিন ফাহল-ট্রাউগবারের মতে, উগ্র ডানপন্থী হলেই যে কেউ গণতন্ত্রবিরোধী হবে, এমনটি বলা যায় না।

তিনি এএফডিকে ‘চরম উগ্র ডানপন্থী’ হিসেবে উল্লেখ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

তার ভাষ্য: ‘যারা আধুনিক গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয় যেমন—গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার ও বহুত্ববাদকে খারিজ করেন; আবার নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন, আমার মতে—তারা চরম উগ্র ডানপন্থি।’

গত ২৫ আগস্ট ডয়েচে ভেলের আরেক প্রতিবেদনে এএফডির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ‘অগ্নিবলয়’ তৈরির বিষয়টি উঠে আসে। জার্মান রাজনীতিতে এএফডিকে মোকাবিলায় ‘অগ্নিবলয়’ শব্দটি জনপ্রিয় করেন দেশটির চ্যান্সেলর ও সিডিইউ নেতা ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ম্যার্ৎস বলেছিলেন, তার নেতৃত্বে এএফডির বিরুদ্ধে একটি ‘অগ্নিবলয়’ তৈরি করা হবে।

কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এই ‘অগ্নিবলয়’ দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কারণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এএফডির সখ্যতার চিত্র দেখা যাচ্ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে এএফডি ধীরে ধীরে একটি ‘স্বাভাবিক’ রাজনৈতিক দল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশের আশঙ্কা, স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হওয়া এই প্রবণতা ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনের ১২ দিন আগে, গত ২৪ আগস্ট ফরেন পলিসি সাময়িকীর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘জার্মানির অগ্নিবলয় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে’।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এএফডিকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখার কৌশল একদিকে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী এই দলটিকে আরও উগ্র করে তুলেছে।

সরকার গঠনের সমীকরণে এএফডি

গত ১২ সেপ্টেম্বর গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে এএফডি মাত্র তিন আসন দূরে রয়েছে। দলটির নেতা উলরিশ সিগমুন্ড অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে নির্বাচিত অধিকাংশ দলই জানিয়েছে, তারা উগ্রবাদী এএফডিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেবে না।

তারপরও যদি অন্য কোনো দলের সমর্থন নিয়ে এএফডি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো একটি চরম উগ্রবাদী দল জার্মানিতে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবে।

ওই প্রতিবেদনে এএফডির নির্বাচনী ফলাফলকে ‘ধ্বংসাত্মক’, ‘৯ মাত্রার ভূমিকম্প’ এবং ‘চরম সতর্কতা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির শাসনব্যবস্থার জন্য এটিকে হুমকি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে যে ‘অগ্নিবলয়’ তৈরির চেষ্টা চলছে, সেটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে।

ইউরোপজুড়ে ডানপন্থার উত্থান নিয়ে আলোচনা

ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে সুইডেন। ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিত উত্তর ইউরোপের এই দেশটির জাতীয় নির্বাচনে মধ্য-বামপন্থী বিরোধী জোট ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোটের চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে।

গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ৩৪৯ আসনের সুইডিশ পার্লামেন্টে বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস ১৭৬টি আসন এবং ক্ষমতাসীন জোট ১৭৩টি আসন পেতে যাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত ফল পেতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।

সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের এই ফল নর্ডিক দেশটির দীর্ঘদিনের উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ধারাকে থামিয়ে দিতে পারে।

আরও বলা হয়, ক্ষমতাসীন জোট আবারও জয়ী হলে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে বামপন্থীরা বিজয়ী হলে সুইডেনের পশ্চিমা মূল্যবোধনির্ভর রাজনীতিতে আঘাত আসতে পারে।

অর্থাৎ ইউরোপ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে রয়েছে।


যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়া হয়ে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

‘মধ্যপন্থা নয়, কট্টরপন্থাই নতুন পথ’?

গত ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন সাময়িকী পলিটিকোর ইউরোপীয় সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘ডানপন্থিদের ক্ষমতায় যাওয়ার নতুন পথ: মধ্যপন্থি হওয়া যাবে না। কট্টরপন্থি হতে হবে।’

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, পূর্ব জার্মানির একটি রাজ্যে এএফডির বিজয় ইউরোপের রাজনৈতিক অনেক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

সেখানে আরও বলা হয়, গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলোর সামনে সাধারণত দুটি পথ ছিল—মধ্যপন্থা গ্রহণ করা অথবা ক্ষমতার বাইরে থাকা। কিন্তু এখন নতুন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: চরমপন্থী অবস্থান গ্রহণ করে নির্বাচনে জয়ী হওয়া।

এএফডির বিজয় আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাশেই আলোড়ন তৈরি করেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।


এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ‘ওয়াও!’ লিখে আত্মতুষ্টি প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জার্মানিকে আবারও ‘মহান’ রাষ্ট্র হিসেবে দেখার প্রত্যয় জানিয়েছেন।

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, অভিবাসন নিয়ে জার্মানি এখন ক্লান্ত। তার দাবি, অভিবাসন জার্মানির অনেক ক্ষতি করেছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর গার্ডিয়ানের এক সংবাদ বিশ্লেষণের শিরোনামে বলা হয়, এএফডির বিজয়ের কারণে ইউরোপের মধ্যপন্থীরা জাতীয়তাবাদীদের নিয়ে ভয় পাচ্ছে এবং এর দায় মধ্যপন্থীদের নিজেদেরও রয়েছে।

ওই বিশ্লেষণে আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাথিজ রুডুজিনের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়। গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপের প্রতি চারজন ভোটারের একজন উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন করছেন। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হিসাব করলে গত তিন দশকে উগ্র ডানপন্থীদের ভোট প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।

গত তিন বছরে এই ভোট আরও ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পলিটিকোর ওই প্রতিবেদনে পর্তুগালের চরম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ‘রিকনকিস্তা’র নেতা আফোনসো গনজালভেসের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। তার মতে, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির বিজয় দেখিয়ে দিয়েছে যে জাতীয়তাবাদ ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতি নির্বাচনে জয় এবং রাষ্ট্রকে রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

এএফডির উত্থান নিয়ে জার্মানিতেও ভিন্ন মত

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এএফডি অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে সামনে রেখে জার্মানির ভোটারদের মধ্যে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছে।

দলটির এই অবস্থানের কারণে জার্মানিতে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর বিদ্বেষমূলক চাপ তৈরি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

তবে অন্য একটি মতও রয়েছে। কারও মতে, পূর্ব জার্মানির একটি রাজ্যে এএফডি জনপ্রিয়তা পেলেও পশ্চিম জার্মানিতে, অর্থাৎ একদা পশ্চিম জার্মানির অংশে দলটির প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। সে কারণে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পূর্ব জার্মানির একটি রাজ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলটির বিজয় নিয়ে এখনই অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তারা।

এএফডিকে ‘নব্য-নাৎসি’ দল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দলটি প্রকাশ্যে ইহুদি-বিদ্বেষী অবস্থান নিচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

ইহুদিদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ

গত ৬ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুসালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে প্রশ্ন তোলা হয়—‘স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে এএফডির বিজয় জার্মানিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, ইহুদিদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কি?’


প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এএফডি আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি জনগোষ্ঠী এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান প্রকাশ করে। কিন্তু ধর্মীয় কারণে পশু জবাইয়ের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানালে দলটির সেই অবস্থান ইহুদিদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া এএফডির নেতাকর্মীদের মুখে এমন কিছু স্লোগানও শোনা যায়, যেগুলো নাৎসি আমলে ব্যবহৃত হতো।

গত ৭ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ইসরায়েল সরাসরি নিন্দা না করলেও এএফডির ঐতিহাসিক বিজয়ে জার্মানির ইহুদিরা আতঙ্কিত’।

অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্য, স্যাক্সনি-আনহাল্টে নির্বাচনী সাফল্যের পর এএফডি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের মতাদর্শ প্রচার ও বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে। তাদের মতে, এর প্রভাব সামগ্রিকভাবে সবার জন্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

আর এ কারণেই জার্মানির এই নির্বাচনী ফলকে ঘিরে ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে।