আসন্ন গণভোটকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। এক প্রশ্নে ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের অনুমোদন নেওয়ার উদ্যোগকে তিনি ‘চালাকি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্তিকর ও অস্বচ্ছ বলে মন্তব্য করেছেন।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণার মধ্যেই গণভোটের কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি সংস্থার এই শীর্ষ কর্মকর্তা লেখেন, ভোটাররা আসলে কী বিষয়ে ভোট দিচ্ছেন—তা অনেকেই পরিষ্কারভাবে জানেন না।
পোস্টে তিনি লিখেছেন,
‘আপনি কি জানেন এই গণভোটে আপনি কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার জন্যও ভোট দিচ্ছেন? আমি জানতাম না। শুধু আমি না। বাড়ির বুয়া থেকে ব্যারিস্টার বন্ধু পর্যন্ত সবাই কনফিউসড এই গণভোট নিয়ে! কারণটা কী?’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আলাদা ব্যালটে ভোটারদের সামনে থাকবে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়, যেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
কিন্তু আসিফ সালেহের অভিযোগ, এই একটি প্রশ্নের আড়ালেই রয়েছে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং বাকি ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
তিনি লিখেছেন, একটি ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমেই নির্বাচনকালীন শাসনব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো, ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক ৩০ দফা অঙ্গীকার এবং নতুন উচ্চকক্ষ গঠনের মতো ‘গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি’ সিদ্ধান্ত একসঙ্গে অনুমোদনের কথা বলা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“এই সবকিছুকে একত্রে একটি প্রশ্নে বেঁধে দেওয়া মানে ভোটারদের প্রকৃত পছন্দের সুযোগ কেড়ে নেওয়া। কেউ হয়ত নির্বাচন কমিশন সংস্কারের পক্ষে, কিন্তু উচ্চকক্ষের বিপক্ষে… কিন্তু এই গণভোটে সেই ভিন্নমত জানানোর কোনো সুযোগ নেই।”
সরকারি প্রচারণার সমালোচনা করে আসিফ সালেহ স্মরণ করিয়ে দেন, কয়েক দিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ' ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।’
এ বক্তব্যকে তিনি ‘বিভ্রান্তিকর এবং অসৎ দাবি’ বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়,
“কোনো একটি গণভোট নিজে থেকেই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না। পরিবর্তন আসে রাজনৈতিক আচরণ, দলীয় সংস্কার, জবাবদিহি এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে… একটি ‘হ্যাঁ’ ভোটকে পরিবর্তনের একমাত্র শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা মানে মিথ্যা আশা দিয়ে বোঝাপড়া চাপিয়ে দেওয়া।”
গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তির ব্যাখ্যায় তিনি লেখেন, ভোটারদের বলা হচ্ছে কী কী সংবিধানে যুক্ত হবে, কিন্তু বলা হচ্ছে না—এর খরচ কত, বাস্তবে এটি কীভাবে কাজ করবে, কিংবা বিদ্যমান সমস্যাগুলো আদৌ সমাধান হবে কি না।
তিনি আরও বলেন,
‘গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে… যদি ভোটাররা না বোঝে, আর তবুও তাদের সম্মতি আদায় করা হয়—তাহলে তা সম্মতি নয়, তা কেবল প্রক্রিয়াগত অনুমোদন।’
আসিফ সালেহের মতে, এই গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে পরিবর্তনের বিরোধিতা নয়; বরং বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করা।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটিতে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। প্রথমে প্রস্তাব ছিল, যেসব বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, ক্ষমতায় গেলে সংশ্লিষ্ট দল সেগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধান না হওয়ায় সরকার গণভোটের পথ বেছে নেয়।
তার ভাষায়, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ এই ৮৪টি ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে, আর ‘না’ জিতলে পুরো জুলাই সনদই কার্যকর হবে না—এখানেও ভবিষ্যৎ ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা রয়েছে।
শেষে তিনি প্রশ্ন তোলেন,
‘বলা হচ্ছে দেশের চাবি আপনার হাতে। আপনি কি আসলেই জানেন আপনি কোন তালা কোন চাবি দিয়ে খুলতে যাচ্ছেন?’