যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি রাজনৈতিক সভাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ইস্ট লন্ডন মসজিদ সংলগ্ন মায়েদা গ্রিল রেস্টুরেন্টে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে আয়োজিত ওই বিশেষ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
পূর্বনির্ধারিত এই সমাবেশ শুরু হওয়ার আগে থেকেই অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে শুরু করেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। পাল্টা প্রতিরোধ হিসেবে এনসিপির কর্মী-সমর্থকেরাও সেখানে শক্ত অবস্থান নেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে এনসিপির নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেখানে দ্রুত শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় আলোচনা সভাটি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পর কড়া পুলিশি পাহারায় হাসনাত আবদুল্লাহ অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান এবং বক্তব্য প্রদান করেন। সভা শেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়েই তিনি সভাস্থল ত্যাগ করেন।
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, সভাস্থল ও এর আশেপাশে উত্তেজনা ছড়ানো এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে লন্ডন পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত তিনজনকে হেফাজতে নিয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে লন্ডন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফসার খান সাদেক রয়েছেন। পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছে—এমন দৃশ্যও দেখা গেছে। তবে আটককৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার সঙ্গীরা যখন একটি পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন কয়েকজন ব্যক্তি তাদের পিছু নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসনাত আবদুল্লাহ পাশের একটি খাবারের দোকানে আশ্রয় নেন। ওই সময়ই তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
প্রকাশিত ভিডিওতে আরও দেখা যায়, ছিটকে আসা ডিম এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক এহতেশামুল হকের শরীরে গিয়ে লাগে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তার সঙ্গে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শাহ শামীমের তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
পুরো ঘটনা প্রসঙ্গে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়, সোমবার বিকেলে এলেম পার্ক এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহ ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক এহতেশামুল হকের আগমনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী উসকানিমূলক আচরণ ও বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টা চালায়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, দলটির এমন কর্মকাণ্ড ছিল কাপুরুষোচিত ও নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। আড়াল থেকে এসে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের তোপের মুখে পালিয়ে যাওয়া আবারও প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগ এখনো ভয়ভীতি প্রদর্শন, অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসী মানসিকতা পরিহার করতে পারেনি।
এনসিপি ইউকে তাদের বার্তায় আরও বলে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মূলত এই ধরনের স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই চিরতরে প্রত্যাখ্যান করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা এবং বিরোধী মত দমনের মানসিকতাই শেখ হাসিনা সরকারের পতন ডেকে এনেছিল এবং তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। স্বৈরাচারী শক্তির পরাজয় অতীতেও হয়েছে, বর্তমানেও তারা রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
পরিশেষে দেশপ্রেমিক প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, যেকোনো ধরনের উসকানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। জুলাই বিপ্লবের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশে যে নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেওয়া হবে না।