শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে ‘কান ধরে ওঠবস’ করলেন ছেলে

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের মরদেহ ফিরে পেতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবির মুখে এক যুবকের কান ধরে ওঠবস করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর চরম উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।

মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে ‘কান ধরে ওঠবস’ করলেন ছেলে
ছবি : সংগৃহীত

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের মরদেহ ফিরে পেতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবির মুখে এক যুবকের কান ধরে ওঠবস করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর চরম উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলার পাল্টাপাল্টি দাবিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ দীর্ঘ সময় উত্তপ্ত থাকে।

মৃতের পরিবারের সদস্যদের দাবি, যথাসময়ে অক্সিজেন সরবরাহ না করায় চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা চিকিৎসকদের সাথে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। অপরপক্ষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর উত্তেজিত স্বজনরা দায়িত্বরত দুই চিকিৎসকের ওপর চড়াও হন এবং তাদের মারধর করেন।

এই ঘটনার জেরে দোষীদের শাস্তির দাবিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা মৃতের মরদেহ আটকে রেখে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন। এর প্রতিবাদে এবং লাশ হস্তান্তরের দাবিতে রোগীর স্বজনরা রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকেরা নিজেদের গাফিলতি আড়াল করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা অজুহাতে মরদেহ আটকে রাখেন। একপর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনড় দাবির মুখে মৃত নারীর ছেলে রিফাত হোসেনকে ডেকে এনে কান ধরে ওঠবস করানোর পর মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই অপদস্থ করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এর আগে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।

জানা গেছে, রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূর নাহার বেগমকে শনিবার ভোরে হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে তার ছোট ছেলে রিফাত হোসেন কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ও ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিব হাসানের সাথে হাতাহাতিতে লিপ্ত হন বলে অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সেবা প্রায় আড়াই ঘণ্টা বন্ধ রাখেন, যা দুপুরের পর পুনরায় চালু হয়। আন্দোলনকারীরা হামলাকারী যুবককে চিকিৎসকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

মৃতের স্বজনরা জানান, মৃত্যুর পর মরদেহ আইসিইউতে রাখা হয় এবং কাউকে দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে বাড়িতে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হলে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা বাধা দিয়ে লাশ পুনরায় মর্গে নিয়ে যান। তবে মরদেহ আটকে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করে ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ জানান, তারা কেবল সহকর্মীদের ওপর হামলার বিচার চেয়ে আন্দোলন করছিলেন।

পরবর্তীতে অভিযুক্ত যুবক পরিচালকের কার্যালয়ে আছেন জানতে পেরে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা সেখানে অবস্থান নেন এবং তাকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর জন্য চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কক্ষের ভেতরে ওই যুবককে ১০ বার কান ধরে ওঠবস করানোর পর মরদেহ স্বজনদের দেওয়া হয়। এর আগে প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করে মৃতের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল থেকে বারবার ক্ষমা চেয়েও তারা মায়ের মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন না এবং লাশ আটকে রাখা হয়েছিল।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, সিসিটিভি ফুটেজে চিকিৎসকদের মারধরের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। জরুরি সেবা বন্ধ ও লাশ সরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে মরদেহটি হিমাগারে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক এজাহার দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং অভিযুক্ত যুবককে পুলিশের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, এই উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।