বৃহস্পতিবার, 5 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

নির্বাচনের আগেই ভাঙবে এনসিপি-জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জোটের ভেতরের অস্থিরতা। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র দ্বন্দ্ব। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন—

নির্বাচনের আগেই ভাঙবে এনসিপি-জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জোটের ভেতরের অস্থিরতা।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র দ্বন্দ্ব।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন—

"এই জোট কি আদৌ অটুট থাকবে?

গত বছরের শেষ দিকে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথা জানায়, তখনই জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। নির্বাচনের আগেই তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তোলে।

পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেলে, এসব দল আসন সমঝোতার আলোচনায় বসে। তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হলে ১১ দলীয় জোটের কাঠামো সামনে আসে।

কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকলেও, এখনো এই ১১ দলের মধ্যে আসন সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বরং তৈরী হয়েছে জোট ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা 

কিভাবে দিন দিন প্রকট হচ্ছে জোট ভেঙে য়াওয়ার আশঙ্কা?

এরই একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আসন সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বেলা তিনটায় সেই সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।

জোটের সমন্বয়ক এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পরিষদের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এক খুদে বার্তায় জানান, “অনিবার্য কারণবশত পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।” 

এই সিদ্ধান্ত জোটের ভেতরে চলমান অস্থিরতারই ইঙ্গিত দেয়।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “আসন সমঝোতা নিয়ে দুই-একটা সমস্যা হয়েছে। সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হবে।”

তবে বাস্তবতা বলছে, সংকট তার চেয়েও গভীর।

১১দলীয় জোটের এই মধ্যকার সংকট আসলে কতটা গভীর? 

সংবাদ সম্মেলনের দিন সকালে জানা যায়, আসন সমঝোতায় অসন্তুষ্ট চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সেখানে থাকবে না।
এমনকি বিকেলে আলাদা সংবাদ সম্মেলনে দলটি জোট ছাড়তে পারে—এমন খবরও ছড়িয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ জানান, “ইসলামী আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি। কিন্তু বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে না থাকার কথা ফোনে জানিয়েছিলো।”

অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান দুপুরে জরুরি বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে বলেন,
“ইসলামপন্থির একবক্স নীতি বহাল রাখতে আলোচনা চলমান।”

এই পরিস্থিতিতে সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, তা স্পষ্ট। 


আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সারা দেশের ৩০০ আসনে মোট ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৬৮টি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০শে জানুয়ারি। অর্থাৎ, এই জোটের হাতে সময় আছে মাত্র ছয় দিন।

ভোটের মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি কি?

এর মধ্যেই সমঝোতার আলোচনা চলাকালে জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৭২টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।

এছাড়া—
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি,
জাতীয় নাগরিক পার্টি ৪৭টি,
এবি পার্টি ৫৩টি,
খেলাফত মজলিস ৬৮টি,
এবং এলডিপি ২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

অন্যদিকে—
জাগপা ৩টি,
খেলাফত আন্দোলন ১১টি,
নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি,
এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে।

জোটের মধ্যে সমঝোতা হলে কিভাবে সাজবে নির্বাচনী মাঠ?

সমঝোতা হলে প্রতিটি আসনে একজন প্রার্থী রেখে বাকিদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জোট নেতারা। এক পর্যায়ে তারা আসন ছাড় দেওয়ার জন্য কিছু যৌক্তিক ক্রাইটেরিয়াও নির্ধারণ করেন।

গত মাসে এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, “ক্রাইটেরিয়া হলো দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সবাই ছাড় দেবে এটা একটা বিষয়। আর যেখানে যার অবস্থা ভালো সেখানে তাকে ছাড় দেওয়া যাবে এটা আরেকটা বিষয়। তবে সংখ্যাটা এখনো বলার মতো না, বলা যাবে না এটা।”

কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় আসন সংখ্যার হিসাব। হিসাব কেন মিলছেনা?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জোট নেতা জানান, ৩০০ আসনের মধ্যে নিজেদের জন্য অন্তত ২১০টি আসন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী।
এতেই জোট শরিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।

বাকি আসনগুলো অন্য দলগুলোর মধ্যে বণ্টনের আলোচনা চললেও, জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত একাধিক বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়নি জামায়াত। প্রথমে ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫টি আসন দেওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৪০টি করার প্রস্তাব আসে।
এনসিপিকে ৩০টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৩টি আসন দেওয়ার আলোচনা হয়।

এছাড়া—
খেলাফত মজলিসকে ৫টি,
এলডিপিকে ৫টি,
এবং এবি পার্টিকে ৩টি আসন ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচন যতই কাছে আসছে, ততই প্রশ্ন বড় হচ্ছে—
১১ দলীয় এই জোট কি শেষ পর্যন্ত ঐক্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি ভাঙনের পথেই হাঁটবে?

সূত্র: বিবিসি