নোয়াখালী সদর উপজেলায় বিএনপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, হামলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেল চারটা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত উপজেলার কালাদরাপ ইউনিয়নের পশ্চিম শুল্লকিয়া গ্রামে এই রণক্ষেত্র তৈরি হয়।
সংঘর্ষ চলাকালে ক্ষুব্ধ কর্মীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি দলীয় কার্যালয় এবং বিএনপির কর্মীদের একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বাসভবন এবং ছাত্রদল কর্মীদের আরও পাঁচটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এই সহিংসতায় কালাদরাপ ইউপি চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহ সেলিম এবং নোয়াখালী শহর শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হৃদয়সহ উভয় পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শ্রমিক দল নেতা হৃদয়ের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে দ্রুত নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বাকিদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, এর আগের দিন শুক্রবার বিকেলে সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধেরহাট বাজারে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিল। এর প্রতিবাদ জানাতে শনিবার বিকেলে একই বাজারে ইউনিয়ন বিএনপি, সহযোগী সংগঠন ও জামায়াতে ইসলামীর যৌথ ব্যানারে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে সেই কর্মসূচি শেষ করে নেতা-কর্মীরা যখন নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরছিলেন, তখনই নতুন করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাঁধেরহাটের সমাবেশ শেষে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জানতে পারেন যে, পাশের কালাদরাপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহর নেতৃত্বে একদল আওয়ামী লীগ সমর্থক পশ্চিম শুল্লাকিয়া গ্রামের দলীয় কার্যালয়ে বসে পাল্টা মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই খবর পেয়ে ছাত্রদলের একদল কর্মী সেখানে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে শ্রমিক দল নেতা হৃদয়ের মাথা ফেটে যায় এবং চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহসহ দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন জখম হন।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে চেয়ারম্যানের অনুসারীরা ছাত্রদল কর্মীদের পাঁচটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে এবং একটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর জবাবে বিএনপি ও ছাত্রদল কর্মীরাও স্থানীয় আওয়ামী লীগের ওই কার্যালয়টিতে অগ্নিসংযোগ করে। সন্ধ্যায় শ্রমিক দল নেতা গুরুতর আহত হওয়ার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির আরও কয়েক শ নেতা-কর্মী ও সমর্থক লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে জড়ো হন এবং ইউপি চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহর বাড়িঘরে ব্যাপক হামলা-ভাঙচুর চালান। পরে সুধারাম থানার পুলিশ এবং নোয়াখালী ক্যাম্প থেকে র্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ইউপি চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহর ছোট ভাই আবির অভিযোগ করে বলেন, তাঁর ভাই বাড়ির পাশের একটি কার্যালয়ে বসে কর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক কথা বলছিলেন। তখন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এসে তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং মারধর করে। পরে এলাকার মানুষ এসে তাঁকে উদ্ধার করে। এরপর সন্ধ্যায় ছাত্রদল কর্মীরা তাঁদের বাড়িতে এসে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
অন্যদিকে জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি রাশেদুল ইসলাম সোহাগ দাবি করেন, বাঁধেরহাটের কর্মসূচি শেষে জেলা শহরে ফেরার পথে চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহর নেতৃত্বে তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে শ্রমিক দল নেতাসহ তাঁদের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হন এবং তাঁদের মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, ঘটনার খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ পাঠানো হয় এবং পরে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব নিয়ে তিনি নিজে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। একটি কার্যালয় ও একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু মোটরসাইকেল ভাঙচুরের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে এবং লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।