মধ্যপ্রাচ্যে রোববার সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজে নতুন করে হামলার ঘটনায় উত্তেজনা বেড়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের একটি তেল পাইপলাইনে হামলা এবং ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রায় যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সপ্তাহান্তের এসব ঘটনায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব থেকে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে সোমবার বাজার খোলার পর তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তেল ব্যবসায়ীরা।
উপসাগরীয় অঞ্চলে সর্বশেষ ঘটনাগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও রোববার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং ক্রুদের সরিয়ে নিতে হয়। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত ও চারজন ক্রু আহত হয়েছেন।
সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে সীমান্তপারের সর্বশেষ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি বাড়ি ও একটি মসজিদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। হামলাটি হুতিরা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পৃথকভাবে হুতিরা জানিয়েছে, তারা পাশের একটি প্রদেশে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহ থেকে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে নিয়মিত সতর্কসংকেত জারি করা হচ্ছে। এর মধ্যে শুক্রবারের ড্রোন হামলায় আরব উপদ্বীপের ওপর দিয়ে যাওয়া ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বৈশ্বিক বাজারে পাঠানোর প্রধান পথ হিসেবে পাইপলাইনটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
একই দিনে হুতিরা পেরিম দ্বীপ দখল করে নেয়। দ্বীপটি বাব এল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত। ‘গেট অব টিয়ার্স’ বা ‘অশ্রুর দরজা’ নামে পরিচিত এই প্রণালিটি লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামেও নতুন রেকর্ড
গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা জুলাইয়ের পর প্রথমবার। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর জ্বালানি ডিজেলের খুচরা দাম রোববার গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ২০ সেন্টের ওপরে উঠে নতুন সর্বকালের রেকর্ড করেছে।
রোববার রয়টার্সকে তেল ব্যবসায়ী ও সৌদি তেল ক্রেতারা জানিয়েছেন, শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরের ইয়ানবু বন্দরে মজুত তেল দিয়ে দেশটি মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে।
এরপর বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে ইতোমধ্যে প্রতিদিন যে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, সেটিও যুক্ত হবে।
পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা এটি কতদিন বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে সৌদি আরব এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিভিন্ন সূত্র মেরামতে কত সময় লাগবে সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। কারও মতে কয়েক দিন, আবার কারও মতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। স্যাটেলাইট ছবিতে পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানের ওপর থেকে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে।
ওমানে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বৈঠক করবে ইরান
আগস্টে এক মাস তুলনামূলক শান্ত থাকার পর, যখন মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছিল, গত দুই সপ্তাহে যুদ্ধ পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে আরও উত্তপ্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছয় মাস আগে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা বন্ধে জুনে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেটি ভেঙে যায়। এরপর যুদ্ধ বন্ধে আর কোনো আলোচনা হয়নি।
তবে বিরল এক কূটনৈতিক উদ্যোগে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার ওমানে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একটি বৈঠকে তারা অংশ নেবেন। সেখানে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে করা হয়েছে বলে দাবি করা একটি সমঝোতা উপস্থাপন করবে ইরান।
তবে এ বিষয়ে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ওমানও প্রকাশ্যে বৈঠকের ঘোষণা দেয়নি বা কোনো সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশও এ বিষয়ে নীরব রয়েছে। ইরাক জানিয়েছে, তারা একটি প্রতিনিধিদল পাঠাবে। অন্যদিকে বাহরাইন জানিয়েছে, তারা কোনো ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করবে না।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শনিবার রয়টার্সকে বলেন, বৈঠকে হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
লন্ডনভিত্তিক প্যান-আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ওমানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
হুতিদের অগ্রযাত্রায় নতুন সংকটে ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার সময় ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, দেশটির প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা ঠেকানো এবং ইরানের জনগণের জন্য তাদের শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।
সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও পরাশক্তির হামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকা ইরান যুদ্ধের পর আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে আসার আশা করছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের নতুন ক্ষমতা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সৌদি আরবে হামলা এবং ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রা ওয়াশিংটনের সামনে নতুন এক সংকট তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার সৌদি মিত্রদের সমর্থন করতে এবং নৌপথে জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে চায়। তবে একই সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধের ফ্রন্টে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী দখল করা পাহাড়ি যোদ্ধা হুতিরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে লড়াই করছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর আগে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধে বেশির ভাগ সময় সরাসরি জড়ায়নি। লোহিত সাগরের উপকূল ধরে তাদের অগ্রযাত্রা ইয়েমেনে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাতের বিস্তারের অংশ।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস ধরে হুতিদের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। তবে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার হুমকি প্রত্যাহার করেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প ওই অভিযান বন্ধ করে দেন।
তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে আপাতত তাঁকে শুধু গোয়েন্দা সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ট্রাম্পও স্বীকার করেন যে তিনি ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, হুতিরাও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়েমেনের যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে বাইরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।