জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্যের পদত্যাগের পর এক যৌথ খোলা চিঠিতে দেশের মানবাধিকার সুরক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ অন্য কমিশনাররা। চিঠিতে বিচারপতি চৌধুরীর পাশাপাশি স্বাক্ষর করেছেন বিদায়ী সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিস।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত নতুন অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরনো আইন পুনর্বহাল করার প্রেক্ষিতে তারা এই বক্তব্য তুলে ধরেন। বিদায়ী কমিশনারদের মতে, এই আইনি পরিবর্তনের ফলে ভুক্তভোগীরা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এবং সংক্ষুব্ধ পক্ষগুলো এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান।
বিদায়ী কমিশনের সদস্যরা চিঠিতে সংসদীয় আলোচনায় উত্থাপিত বেশ কিছু তথ্যের অসংগতি তুলে ধরেছেন। তারা জানান, সংসদে গুমের সাজা নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা সঠিক নয়; বাতিলকৃত অধ্যাদেশে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। এছাড়া তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জরিমানার বিধান অধ্যাদেশে স্পষ্ট থাকলেও পুনর্বহালকৃত পুরনো আইনে এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত। তারা আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন কেবল মানবতাবিরোধী বা গণহারে সংঘটিত গুমের বিচার করতে পারে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন গুমের বিচারের জন্য যে বিশেষ আইনি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল তা বর্তমান অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে বিলুপ্ত হয়েছে। এর ফলে গত ১১ এপ্রিলের পর নতুন কোনো গুমের ঘটনা ঘটলে তার বিচারিক পথ রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়েও চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদায়ী সদস্যরা জানান, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী মানবাধিকার কমিশন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখত। কিন্তু ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী কমিশন এখন আর নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সরাসরি তদন্ত করতে পারবে না। ফলে যারা নিজেরাই জুলাই মাসের আন্দোলনে সরাসরি পক্ষ ছিল, সেই সরকারি বাহিনীগুলোর হাতেই তদন্তের ভার ফিরে গেছে, যা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে এবং আন্দোলনকারীদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
চিঠিতে সরকারের প্রকৃত আপত্তিগুলো চিহ্নিত করে বলা হয়েছে যে, মূলত মানবাধিকার কমিশনের প্রশাসনিক ও আইনি স্বাধীনতা সংকুচিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কমিশনকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রভাব বৃদ্ধি করার মাধ্যমে কমিশনকে ফের দলীয়করণের পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। বিশেষ করে গুমের সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা মানবাধিকার সুরক্ষাকে দুর্বল করবে বলে তারা মনে করেন।
পরিশেষে বিদায়ী কমিশনাররা প্রস্তাব করেছেন যে, ভবিষ্যতে যদি সরকার নতুন কোনো আইন প্রণয়ন করে, তবে তা যেন অবশ্যই ২০২৫ সালের বাতিলকৃত অধ্যাদেশগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, গুম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে আইনত বাধ্য। অধ্যাদেশগুলো বাতিলের আগে ব্যাপক জনমত ও অংশীজনদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তারা জানান, আইনি শূন্যতা তৈরি না করেও সংশোধনের পথ খোলা রাখা যেত। নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কেবল আশ্বাসে নয়, বরং কার্যকর ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষার মাধ্যমেই তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন বলে চিঠিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।