আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার বা নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে। এই ইশতেহারগুলোতে দেশকে নতুনভাবে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে, এগুলো সাধারণ মানুষের কাছে কতটা স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য দল তাদের ভোটারদের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তবে মূল প্রভাব দেখা যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের ইশতেহারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বেশির ভাগ ইশতেহারে নতুন আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেকটাই পুরনো ও বাস্তবায়নহীন প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি। এছাড়া বেশিরভাগ ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির ইশতেহার
এবারই প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের দায়িত্ব নেয়ার পর তার নেতৃত্বে দলটি এবার নির্বাচনী প্রস্তুতি চালাচ্ছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা দেওয়া হবে। পরিকল্পনায় রয়েছে এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ, শিক্ষাক্ষেত্রে দুপুরের খাবার বা ‘মিড ডে মিল’, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা। এছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
মোট ৫১টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে তারেক রহমান বলেন, “কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা যাবে না, যদি না দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেওয়া যায়।”
ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, জুলাই হত্যার বিচার এবং গণ-অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ৫ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সার্ভিস রুল, পেনশন ফান্ড, বেকারভাতা এবং আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ইশতেহারে ভোটার মন জয় করার চেষ্টা স্পষ্ট, তবে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল নেই।
জামায়াতের ইশতেহার
ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, যা ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশিত। জামায়াত ২৬টি বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে এবং আলাদা করে ৪১ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
জামায়াতের ইশতেহারে নারী বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মজীবী নারীদের জন্য কর্মঘণ্টা তিন ঘণ্টা কমানোর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। দলটি জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করবে এবং সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দেশে ও দেশের বাইরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে জামায়াতের অতীত অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
এনসিপির ইশতেহার
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে অংশ নিচ্ছে। ইশতেহারে জুলাই ২০২১ ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচার, ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর, এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান, ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ও এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি, ছয় মাস বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, মেধাবীদের দেশে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহার
চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন ৩০ দফা মৌলিক প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেছে। এতে নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন, কার্যকর সংসদ, পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। দলটি ১২টি বিশেষ কর্মসূচি, ৮ দফা নীতিগত অবস্থান, ৬ দফা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা ও ২৮টি উন্নয়ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা কী বলছেন
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, “কর্তৃত্ববাদের পতন পরবর্তী সময়ে দলগুলো ভোটার প্রত্যাশা বিবেচনা করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এগুলো বাস্তবায়ন করার স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই।”
দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মনে করেন, নির্বাচনের আগে ইশতেহার ঘোষণা প্রচলিত হলেও পরে তা বাস্তবায়ন না হওয়ার চর্চা আছে। এবারের ইশতেহারে নতুন ও পুরনো প্রতিশ্রুতির সমাহার রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য অর্থ, সততা ও দক্ষতার প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা