শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

‘বেপরোয়া’ এআই উন্নয়নে লাগাম টানার আহ্বান আমোদেইর, সমর্থন অল্টম্যান-মাস্কের

অ্যানথ্রপিকের সাবেক এক কর্মী সতর্ক করেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। ওই গবেষক জ্যাকব কক্সন একাধিক পোস্টে বলেছিলেন, এআইয়ের হুমকি মোকাবিলায় অ্যানথ্রপিক ও তাঁর আগের প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না বা বিষয়টি ভুলভাবে মোকাবিলা করছে—এ কারণে তিনি চাকরি ছেড়েছেন।

‘বেপরোয়া’ এআই উন্নয়নে লাগাম টানার আহ্বান আমোদেইর, সমর্থন অল্টম্যান-মাস্কের
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ড্যারিও আমোদেই (মাঝে), টেসলা-স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক (বাঁয়ে) এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান (ডানে)

এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যারিও আমোদেই। তাঁর এই আহ্বানে সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ও টেসলা-স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক। আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআই উন্নয়নের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে এক বছরের মধ্যেই আরও সক্ষম এআই এজেন্টের একটি বড় ‘ঝাঁক’ তৈরি হতে পারে, যা পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমোদেইয়ের এই সতর্কবার্তা এসেছে এআই এজেন্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এবং সাইবার হামলার সক্ষমতা নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগ বাড়ার মধ্যে। এআই শিল্পের উন্নয়নের গতি কমাতে তিনি তিন দফা পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছেন। আর বিরল এক ঐকমত্যে তাঁর সেই উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রযুক্তি খাতের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা অল্টম্যান ও মাস্ক।

একটি নিবন্ধে ‘কেন এআই শিল্পের উন্নয়নের গতি কমানো উচিত’—সে বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন আমোদেই। তাঁর তিন দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রয়েছে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের এআই নির্মাতাদের গবেষণা প্রক্রিয়ায় সার্বক্ষণিক প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব।

আমোদেই বলেন, ‘এআই খুব দ্রুত তৈরি করা বেপরোয়া কাজ।’ তাঁর আশঙ্কা, চলতি গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের শত শত এআই এজেন্ট হাগিং ফেসের ওয়েবসাইটে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করার পর আরও বেশি সক্ষম কিন্তু একইভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এআইয়ের একটি ঝাঁক তৈরি হলে তা শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করতে পারে। এ ধরনের এআই একটি স্থায়ী বটনেট তৈরি করে ‘পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে’ পারে বলেও তিনি আশঙ্কা করেন। তবে কয়েকজন এআই বিশেষজ্ঞ এই সম্ভাবনাকে খুব একটা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেছেন এবং বিষয়টি সংশয় নিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।

টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একাধিক পোস্টে আমোদেইয়ের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানান। তিনি লেখেন, ‘ড্যারিও ঠিক বলেছেন।’

মাস্ক বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এআই নিয়ে সতর্ক করে আসছি।’ এ সময় ২০১৪ সালের একটি পোস্টের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এআই নিয়ে আমাদের খুবই সতর্ক হতে হবে। এটি সম্ভাব্যভাবে পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।’

আমোদেইয়ের এই আহ্বান এমন সময়ে এল, যখন অ্যানথ্রপিক যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও। প্রতিষ্ঠানটি শিগগিরই ২ ট্রিলিয়ন ডলার বা এর বেশি মূল্যের আইপিওর বিপণন শুরু করতে পারে।

ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান শনিবার আমোদেইয়ের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত পর্যায়ের এআই উন্নয়নের গতি নির্ধারণে আমাদের যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সে বিষয়ে আমি ড্যারিওর সঙ্গে একমত।’

স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের কর্মীদের মতোই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাবকে তিনি ‘দারুণ ধারণা’ বলে উল্লেখ করেন। ওপেনএআইও একই ব্যবস্থা করবে বলে জানান অল্টম্যান। এ বিষয়ে শিগগিরই আরও বিস্তারিত জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এ ছাড়া ২০২৬ সালে ওপেনএআই শেয়ারবাজারে আসছে না বলেও জানান অল্টম্যান। এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ফরচুনকে অল্টম্যান বলেন, ‘নিরাপত্তা নিয়ে এখন যা কিছু ঘটছে, তা বিবেচনায় নিয়ে আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে শেয়ারবাজারে আসা ঠিক হবে না। আর এ নিয়ে আমরা কোনো চাপও অনুভব করছি না।’

তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি, আমোদেই, মাস্ক এবং মেটা ও গুগলের প্রধান নির্বাহীরা একসঙ্গে বসে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর বিষয়ে অভিন্ন অবস্থানে আসছেন না কেন। জবাবে অল্টম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয়, সেটা হবে।’

গুগল ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ডেমিস হাসাবিসও আমোদেইয়ের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন, তবে এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত মোকাবিলায় দিকনির্দেশনাটি সঠিক।’

এআই উন্নয়নে সমন্বয়ের প্রস্তাব

আমোদেইয়ের পরিকল্পনায় মার্কিন সরকারের কাছ থেকে একটি বিশেষ ছাড় চাওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সীমান্ত পর্যায়ের এআই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতাবিরোধী আঁতাতের অভিযোগে শাস্তির মুখে না পড়ে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবে।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সহসভাপতি ডেভিড স্যাকস এ প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘অন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন আছে—এমন ভান করা বন্ধ করুন।’

তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের গতি কমানোর উদ্দেশ্য পুরোপুরি পরোপকারী—এমন ভানও করা উচিত নয়। তাঁর ভাষ্য, কোনো এআই পণ্য যদি সত্যিকারের ভয়াবহ সাইবার হামলা ঘটাতে সক্ষম হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে পণ্যের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য বিপুল আইনি দায়ের মুখে পড়তে হতে পারে।

এআই অধ্যাপক, নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারক এবং যুক্তরাজ্য সরকারের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডেভিড ক্রুগার বলেন, ‘এই পরিকল্পনা ঝুঁকিকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে কমায় না, এবং ড্যারিওও এমন দাবি করছেন না।’

এদিকে রাজা তৃতীয় চার্লস চলতি সপ্তাহে শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এআই প্রযুক্তি কীভাবে ‘মানবতার কল্যাণে’ উন্নত করা যায়, তা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।

স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ওই আলোচনার মাধ্যমে এআই উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত ‘দায়িত্ব’ সম্পর্কে আরও ব্যাপক বোঝাপড়া তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

রাজপরিবারের এক সূত্র পত্রিকাটিকে বলেন, ‘রাজা সেখানে আলোচনাগুলো আয়োজন, শোনা এবং উৎসাহিত করার জন্য থাকবেন এবং এই প্রশ্নটি তুলবেন—“মানবতার কল্যাণে আমরা কীভাবে এআই উন্নয়ন করব?”’

অনুষ্ঠানটিতে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, হাসাবিস, আইওনকিউয়ের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী নিকোলো দে মাসি এবং এআই ও প্রযুক্তির নৈতিকতা বিষয়ে পোপের উপদেষ্টা পাওলো বেনান্তির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ডিচলি ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানটি হবে। প্রতিষ্ঠানটি এআই নেতাদের জন্য একটি খসড়া সনদও তৈরি করেছে।

ওপেনএআইয়ের গবেষক এইডান ম্যাকলাফলিন আমোদেইয়ের নিবন্ধটিকে ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, নিবন্ধটির ‘প্রায় প্রতিটি শব্দের সঙ্গেই’ তিনি একমত।

আমোদেই বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রথম পদক্ষেপটি ‘একতরফাভাবে’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অ্যানথ্রপিক তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারীদের নিজেদের ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে কর্মীদের সমপর্যায়ের প্রবেশাধিকার দেবে। এর মাধ্যমে তাঁরা নিরাপত্তাব্যবস্থা মানা হচ্ছে কি না যাচাই করতে, বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবেদন দিতে এবং প্রশিক্ষণের সময় এআই মডেলগুলোর মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য মূল্যায়ন করতে পারবেন।

এআই নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে চাপ

এআই এজেন্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বাইরের সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা এবং প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কারণে এআই নিরাপত্তা গবেষকদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়মের দাবি বাড়ছে।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের রাজনীতিকেরাই এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং আরও পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সপ্তাহান্তে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বৃহস্পতিবার ব্যক্তিগতভাবে ডেমোক্র্যাটদের তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এআই তদারকিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলীয় নেতাদের তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি বিষয়, যা বেসরকারি খাতে খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তাহলে আমার মনে হয় এটি বিপজ্জনক হতে পারে।’

অ্যানথ্রপিকের উপদেষ্টা ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক রোববার লেখেন, ‘এআই নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কীভাবে সীমা নির্ধারণ করা যায়, সে বিষয়ে ভাবার জন্য আমরা একটি সতর্কবার্তা পেয়েছি। সরকারগুলো যদি এতে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।’

এর আগে বুধবার অ্যানথ্রপিকের সাবেক এক কর্মী সতর্ক করেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। ওই গবেষক জ্যাকব কক্সন একাধিক পোস্টে বলেছিলেন, এআইয়ের হুমকি মোকাবিলায় অ্যানথ্রপিক ও তাঁর আগের প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না বা বিষয়টি ভুলভাবে মোকাবিলা করছে—এ কারণে তিনি চাকরি ছেড়েছেন।

সাবেক কর্মীর এই মতামত সম্পর্কে জানতে চাইলে আমোদেই বলেন, ‘আমি জ্যাকবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার চেয়ে তাঁর সঙ্গে অনেক বেশি একমত... আমার মনে হয়, পরিস্থিতি ভুল দিকে যাওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা খুব বেশি নয়।’

সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে সর্বনাশের আশঙ্কা করা মানুষ নই। আমি মনে করি, এই প্রযুক্তি নিরাপদভাবেই তৈরি করা সম্ভব।’