মঙ্গলবার, 22 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

লোহিত সাগরে হুতিদের অগ্রযাত্রা, তেলের পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব

ইরাকের ভূখণ্ড থেকে আসা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরের কৌশলগত দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

লোহিত সাগরে হুতিদের অগ্রযাত্রা, তেলের পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব

ইরাকের ভূখণ্ড থেকে আসা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরের কৌশলগত দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পাইপলাইনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ইরাকের ভূখণ্ড থেকে উড্ডয়ন করেছিল। ইরাক সরকারও জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডের মায়সান প্রদেশের একটি এলাকা থেকে হামলাটি পরিচালিত হয়েছে। এরপর প্রদেশটিতে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা একজন কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।


ইরানের সীমান্তবর্তী মায়সান প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে। তবে সর্বশেষ হামলার সঙ্গে কোন গোষ্ঠী জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর আগে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে দেশটির তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর অভিযোগ তুলেছিল।

সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আপাতত কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি। হামলা বন্ধে ইরাক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতেও সমর্থন জানাচ্ছে রিয়াদ। তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, স্থাপনা ও জনগণকে সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরবের রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত আবকাইককে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাইপলাইনটির ব্যবহার বাড়িয়ে দেয় সৌদি আরব। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ পথে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। পরিমাণটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় চার থেকে পাঁচ শতাংশের সমান।


এদিকে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে। ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতিরা। পাশাপাশি পেরিম ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং মোখা ও ধুবাবের মতো উপকূলীয় এলাকাতেও তাদের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এই জলপথের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতিদের এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে ইরানের সরাসরি দিকনির্দেশনার সম্পর্ক রয়েছে। তবে হুতিদের সামরিকভাবে পরিচালনা করার অভিযোগ ইরান বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা—দুই ঘটনাকেই আঞ্চলিক সংঘাতের একটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।


এর আগে জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছিল হুতিরা। সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করেও তারা হামলা চালিয়েছে। শুক্রবারের অগ্রযাত্রার পর হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রয়েছে।

পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এবং হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তা চান।

তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি। এর পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাহরাইন, জর্ডান ও কাতার। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ঘটনাটিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং একে সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য হুমকি’ বলে অভিহিত করেছে।

হামলার পর ইরান সীমান্তের সঙ্গে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিংও সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে ইরাক। একই সঙ্গে হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে দেশটিতে ব্যাপক অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে ইরাকের নিরাপত্তা সূত্র।