বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তায় এবার নিজেদের সামরিক শক্তি ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একটি স্থায়ী ও সমন্বিত ‘ইউরোপীয় সেনাবাহিনী’ গঠনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ইইউ প্রতিরক্ষা কমিশনার আন্দ্রিয়াস কুবিলিয়াস।
সুইডেনে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সম্মেলনে কুবিলিয়াস প্রায় ১ লাখ সদস্যের একটি শক্তিশালী ও একক বাহিনী গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। বর্তমানে ইউরোপের ২৭টি দেশের পৃথক ও ছোট ছোট সেনাবাহিনী রয়েছে। কুবিলিয়াসের মতে, বিচ্ছিন্ন শক্তির পরিবর্তে একটি সুসংগঠিত ইউরোপীয় শক্তিই এখন সময়ের দাবি, যা ইউরোপকে ভূ-রাজনীতিতে স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে তুলবে।
প্রতিরক্ষা কমিশনার তার বক্তৃতায় সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর দীর্ঘদিনের সামরিক ভাবনার কথা পুনরায় সামনে আনেন। তিনি কেবল সেনাবাহিনী গঠনের প্রস্তাবই দেননি, বরং ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল’ নামে ১০ থেকে ১২ সদস্যের একটি শক্তিশালী নীতিনির্ধারক কমিটি গঠনের পরামর্শও দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই কমিটিতে ইইউ সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কুবিলিয়াস সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ইউক্রেন সংকটের রেশ কাটলেও রাশিয়া তার যুদ্ধকালীন অর্থনীতি বজায় রাখবে, তাই ইউরোপকে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষার দিকে নজর দিতেই হবে। তবে ক্রেমলিন এই আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে।
কেন এই নিজস্ব বাহিনীর চিন্তা?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোপের এই সামরিক পরিবর্তনের পেছনে ‘ট্রাম্প আতঙ্ক’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর পররাষ্ট্রনীতি বড় প্রভাব ফেলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ভেনিজুয়েলায় অভিযান বা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের মতো ঘটনাগুলো ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বিগ্ন করেছে। বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ১ লাখ মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করলে এই সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হতে পারে।
আটলান্টিক সম্পর্কের এই দোলাচল আর ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ে ইউরোপ এখন নিজস্ব সামরিক শক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজছে।