সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে?

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে দিল্লির সাম্প্রতিক অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, ঢাকা হাসিনাকে হস্তান্তরের যে আবেদন করেছে, তা বর্তমানে নয়াদিল্লির বিবেচনাধীন রয়েছে।

ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে?
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে দিল্লির সাম্প্রতিক অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, ঢাকা হাসিনাকে হস্তান্তরের যে আবেদন করেছে, তা বর্তমানে নয়াদিল্লির বিবেচনাধীন রয়েছে।

দিল্লির সুর বদলের আভাস?

গত ১৭ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গণমাধ্যমকে জানান যে, হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের ‘অনুরোধটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’ তিনি একে ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে অভিহিত করেন। জয়সওয়ালের এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এর মাধ্যমে ভারত সরকার কেবল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ পাওয়ার বিষয়টিই স্বীকার করেনি, বরং এটি নিয়ে যে তারা কাজ শুরু করেছে, সেই বার্তাও দিয়েছে।

কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি ভারতের দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থানের কোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত? সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফরকালে এস জয়শঙ্করের সাথে বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন, যার পর ভারতের এই প্রতিক্রিয়া এল।

আইনি মারপ্যাঁচ ও ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা

হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন এবং দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তিই মূল আইনি ভিত্তি। মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জির মতে, ‘এই আইনের নিয়মগুলো মেনেই সব ব্যবস্থা নিতে হবে।’

প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, অনুরোধ পাওয়ার পর ভারত সরকার একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করবে। সেই ম্যাজিস্ট্রেট খতিয়ে দেখবেন যে হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটুকু। ম্যাজিস্ট্রেট তখন ‘পলাতক অপরাধীকে’ (আইনি পরিভাষা) হাজির করার জন্য পরোয়ানা জারি করতে পারেন। তবে হাসিনা যেহেতু বর্তমানে ভারত সরকারের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছেন, তাই এক্ষেত্রে সরাসরি হাজিরাই মূল বিষয় হবে।

আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট এমনভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করবেন যেন সেই মামলার বিচার ভারতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি দেখবেন যে অভিযোগগুলো ভারতেও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো কি না। যদি প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে তিনি হাসিনাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন।

'রাজনৈতিক সহিংসতা' বনাম 'মানবতাবিরোধী অপরাধ'

প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কিছু বিশেষ শর্ত রয়েছে যা ভারতের হাতে 'না' বলার সুযোগ রাখে। উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, ‘আইন ও চুক্তি অনুযায়ী ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। যদি অভিযোগগুলো রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, অথবা যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি (এক্ষেত্রে হাসিনা) প্রমাণ করতে পারেন যে বাংলাদেশে তিনি ন্যায্যবিচার পাবেন না, তাহলে ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকার করতে পারে।’

তবে আইন স্পষ্টভাবে বলছে, হত্যা, অপহরণ বা গুমের মতো জঘন্য অপরাধগুলো কখনোই 'রাজনৈতিক অপরাধ' হিসেবে গণ্য হবে না। উল্লেখ্য যে, হাসিনা বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। ভারতে এই নির্দিষ্ট নামে আইন না থাকলেও হত্যা বা গুমের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি সুরক্ষা রয়েছে।

সদিচ্ছা না প্রতিহিংসা: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার?

আইনি পর্যালোচনার চেয়েও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে কূটনৈতিক উদ্দেশ্য। আইনজীবীর মতে, বিচার প্রক্রিয়াটি প্রতিহিংসামূলক কি না, তা ভারত সরকার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনুরোধটি সদিচ্ছা থেকে করা হয়েছে কি না এবং হাসিনা সুষ্ঠু বিচার পাবেন কি না, তা নির্ধারণ করবে ভারত সরকার। ম্যাজিস্ট্রেট এই সিদ্ধান্ত দেবেন না।’

দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকার সম্ভাবনা

ভারত এখনো হাসিনার অবস্থান স্পষ্ট করেনি; তাকে কেবল ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শরণার্থী সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। ভারত আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর না করলেও নিজস্ব রীতিনীতি অনুসরণ করে।

ইতিহাস বলছে, ভারত থেকে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধী প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাধারণত ৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে হাসিনার ক্ষেত্রেও দ্রুত কোনো সমাধান আসবে নাকি বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে।