বর্ষায় ফুঁসে ওঠা তিস্তা শুষ্ক সময়ে যেন একেবারে ভিন্ন চেহারা নেয়। বিস্তীর্ণ বালুচর, চিরে যাওয়া মাটি—দূর থেকে দেখলে নদীর চেয়ে মরুভূমিই মনে হয় বেশি। পানির সংকটে উত্তরাঞ্চলের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে বড় পরিবর্তন। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা—তিস্তার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। জীববৈচিত্র্য কমে গেছে, জেলে-মাঝিদের নৌকা পড়ে থাকে ঘাটে, কৃষকেরা তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে বহু পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।
উত্তরের মানুষের কাছে তিস্তা কেবল একটি নদী নয়; এটি একদিকে জীবিকার অবলম্বন, অন্যদিকে দুর্ভোগের প্রতীক। জাতীয় উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যানের আড়ালে তিস্তাপারের মানুষের হাহাকার চাপা পড়ে থাকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই আবার আলোচনায় আসে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বহু দশক ধরে শোনা এই পরিকল্পনার কাজ এখনো কাগজেই সীমাবদ্ধ।
রংপুরের কাউনিয়ার টেপামধুপুর ইউনিয়নের চরগনাই এলাকার স্কুলশিক্ষক আজগর হোসেন বলেন, ‘সবাই তিস্তা নিয়ে রাজনীতি করেছে, তবে তিস্তাপারের মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই।’
নব্বইয়ের দশক থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন স্থানীয়রা। সরকার বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু তিস্তার পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং অগ্রাধিকার সংকটে মহাপরিকল্পনা বারবার আটকে গেছে।
ভারতের সিকিম থেকে নেমে আসা তিস্তা বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই গজলডোবা ব্যারাজে নিয়ন্ত্রিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, উজানে পানি আটকে রেখে ভারত একতরফাভাবে ব্যবহার করছে। ফলে বর্ষাকালে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে বন্যা দেখা দেয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচের সময় পর্যাপ্ত পানি মেলে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে অন্তত ১০ হাজার কিউসেক পানি থাকার কথা, সেখানে শুষ্ক সময়ে অনেক সময় ২০০ কিউসেকও পাওয়া যায় না। যৌথ নদী কমিশনের হিসাবে, ১৯৮৭ সাল থেকে পানি প্রত্যাহারের সংকট বাড়তে শুরু করে এবং ২০০০ সালের পর তা আরও তীব্র হয়। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি হলেও সীমান্ত এলাকায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাস্তবে পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত নাও হতে পারে। তবু একটি চুক্তি হলে অন্তত কূটনৈতিক চাপ তৈরি হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, তিস্তা প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টন পলি বহন করে আনে। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে এবং অল্প পানিতেই নদী উপচে আশপাশের জনপদ প্লাবিত হচ্ছে। একদিকে বর্ষায় অতি বৃষ্টিতে বন্যা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা—এই দুই চরম অবস্থার মাঝে দুলছে তিস্তাপার।
নদীর পানি সরে গেলে জেগে ওঠা চরে এখন কৃষিকাজ হচ্ছে। পাঁচ জেলার ৭৩৪টি চরে প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে রবিশস্য আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়ার কৃষকদের ভাষ্য, নদীতে পানির ঘাটতির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সেনিকের ঝুঁকি এবং মাছের প্রাচুর্য কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, নদীর শুষ্কতার প্রভাবে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বামজোট নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে যাচ্ছে।’
লালমনিরহাটের আদিতমারীর দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামে গেলে নদীভাঙনের ভয়াবহতা চোখে পড়ে। ফসলসহ জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে, শোনা যায় ভাঙনের শব্দ। কৃষক জামাল উদ্দিন ইতিমধ্যে ১২ বিঘা জমি ও বসতভিটা হারিয়েছেন। জীবনে দুবার নতুন করে বাড়ি তুলতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর প্রশ্ন, সরকার এলেই বলে এটা করবে, সেটা করবে। কিন্তু করে না কিছু।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানীর দাবি, নদীভাঙনে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে এবং বাড়ছে জলবায়ু শরণার্থী।
নির্বাচন সামনে এলেই তিস্তা নিয়ে আন্দোলন, সমাবেশ ও প্রতিশ্রুতির জোয়ার বাড়ে। গত বছরও পানির ন্যায্য হিস্যা ও মহাপরিকল্পনার দাবিতে রংপুর অঞ্চলে নানা কর্মসূচি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে উত্তরবঙ্গে প্রথম কোদাল পড়বে তিস্তায়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, সরকার গঠন করতে পারলে দ্রুত মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করবেন।
সরকার ঘোষিত ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’, যা ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নামে পরিচিত, এর আওতায় রয়েছে নদী খনন, ভূমি পুনরুদ্ধার, বাঁধ নির্মাণ, চর উন্নয়ন, কৃষিজমি পুনর্বাসন এবং নদীপারে স্যাটেলাইট শহর স্থাপনের পরিকল্পনা।
গত ১৯ জানুয়ারি রংপুর সফরে কাউনিয়ার টেপামধুপুর তালুক শাহবাজপুর এলাকায় ভাঙনপ্রবণ তিস্তা পরিদর্শন শেষে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীন সরকার উভয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে তাদের ইশতেহারে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তাই তাড়াহুড়ো করে কাজটি শুরু হবে তা নয়, আমরা একটু সময় দিই যেন কাজটি আরও ভালোভাবে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ ছাড়া এটি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। তাই আমরা মনে করি, নির্বাচিত সরকার এসে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কাজ করবে। নির্বাচিত সরকার এসে যেন তাদের অপেক্ষা করতে না হয়, সেই প্রস্তুতিটা আমরা গঙ্গা ও তিস্তার ক্ষেত্রে করে দিয়েছি।’
লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের বিষয়। সব পক্ষকে একমত হতে হবে।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘এখন দেশের সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ তিস্তা মহাপরিকল্পনা। দেশে অতীতে তিন লাখ কোটি টাকায় অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও সরকার মাত্র সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেনি। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এবার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মহাপরিকল্পনার কথা বলেছে। আশা করি, এবার আর তিস্তা তীরের মানুষকে হতাশ করবে না নতুন সরকার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হলে পাঁচটি জেলার তিস্তা অববাহিকায় কোটি মানুষ উপকৃত হবে।’
তিস্তা তাই আবারও ভোটের ইস্যু। প্রশ্ন একটাই—এবার কি প্রতিশ্রুতি পেরিয়ে বাস্তবে রূপ নেবে মহাপরিকল্পনা?