আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে লেবানন ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার পরেও লেবাননের বিভিন্ন প্রান্তে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রাণঘাতী বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই লাগাতার সামরিক অভিযানে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে তিন হাজার পাঁচশত ছাব্বিশ জনে পৌঁছেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই রক্তাক্ত সংঘাতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে দশ হাজার সাতশত তেত্রিশ জন সাধারণ মানুষ গুরুতর জখম হয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া এই নতুন যুদ্ধবিরতির খসড়া প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতা নাইম কাসেম এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটিকে চরম অপমানজনক হিসেবে অভিহিত করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলি সেনাদল লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তাদের এই প্রতিরোধ সংগ্রাম ও পাল্টা আঘাত অব্যাহত থাকবে।
আমেরিকার তৈরি করা সেই শান্তি প্রস্তাবে ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে এক ধরণের সমঝোতার রূপরেখা ছিল, যেখানে হিজবুল্লাহর সমস্ত সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা, দক্ষিণ লেবাননের নির্দিষ্ট কিছু সীমান্ত এলাকা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া এবং সেসব অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে লেবানন জাতীয় সেনাবাহিনীর হাতে সঁপে দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছিল। তবে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক উইং স্পষ্ট করেছে যে, তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও মতামত ছাড়া পাস হওয়া এই ধরণের কোনো একতরফা চুক্তি তারা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবে না।
আন্তর্জাতিক মহলের এই যুদ্ধবিরতির নানামুখী চেষ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। এর জবাবে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারাও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ড্রোন ও রকেট নিক্ষেপ করে চলেছে, যার ফলে সীমান্ত অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও বেশি জটিল ও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
ভয়াবহ এই যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে লেবাননের প্রায় বারো লাখের বেশি নাগরিক নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানিয়েছে যে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই সংঘাতের জেরে বিপুল সংখ্যক শিশুর হতাহতের ঘটনা ঘটছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
অন্য দিকে লেবাননের রাষ্ট্রপ্রধান জোসেফ আউন এই মার্কিন মধ্যস্থতার উদ্যোগটিকে দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ফিরিয়ে আনার একটি চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করলেও, হিজবুল্লাহর এমন কঠোর অবস্থানের কারণে শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনিশ্চয়তার আবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।