সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতে পিছপা হবে না পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যের নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। বক্তব্যটি অবিলম্বে প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাঁর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। কয়েকটি সংগঠন তাঁকে দায়িত্ব থেকে অপসারণেরও আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার পুরান ঢাকায় ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, “আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেইটা করব।”
বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ারকে ‘বিচারবহির্ভূত নির্মম হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে অতীতে সংঘটিত এসব ঘটনার বিচারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সরকারের নয় মাসের মাথায় আইজিপির এমন মন্তব্যের কারণে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও গুপ্তহত্যার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়ে। ওই সময়ে র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
সোমবার এক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। পুলিশ নাগরিকদের সেবক, শাসক নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান হিসেবে এমন বক্তব্য দিয়ে আইজিপি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুবায়ের আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মধ্যে আইজিপির এমন বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেত। তাঁর মতে, এ বক্তব্য দেশে আবারও ভয়ের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয় এবং রাষ্ট্রকে নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্তের নকশা।
বিকেলে একটি গণসংযোগ কর্মসূচিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহও আইজিপির বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি আইজিপিকে ‘গুণ্ডা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ মানুষকে গুলি করবে—এমন কথা বলা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ক্রসফায়ারের মাধ্যমে মানুষ হত্যার প্রবণতা অতীতের বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারাবাহিকতারই অংশ। এ ধরনের ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে পুলিশকে আবারও কলঙ্কিত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানান। তাঁরা বলেন, সরকারের অনুমোদন থাকলেই কোনো নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার অবশ্যই সংবিধান, আইন ও মানবাধিকারের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এ বিষয়ে তাঁরা সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেন।
পৃথক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য উদ্বেগজনক এবং তা অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পুলিশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, তাঁরা বিশ্বাস করতে চান, আইজিপি হালকা মেজাজে মন্তব্যটি করেছেন। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন হালকা মন্তব্য করার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীনও বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল তুলে ধরার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা বলা পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
আতাউল্লাহ আমীন বলেন, সরকার অনুমোদন দিলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৈধ হয়ে যায় না। অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর হতে হবে, তবে সেই কঠোরতা অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। তিনি আইজিপির বক্তব্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন।
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, পুলিশ মহাপরিদর্শকের এ বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
টিআইবি বক্তব্যটিকে সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ বলেও বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহার, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মন্তব্যের জন্য আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? সরকারের অনুমতির শর্ত যুক্ত করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার পথ খোঁজা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশের দায়িত্ব হলো পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং এটি পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।
তিনি আরও বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। এ দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয় লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মতে, পুলিশপ্রধানের এমন ‘বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী’ বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনিভাবে বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগ নিয়েও আইজিপির বক্তব্যের সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রকাশ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, বক্তব্য প্রত্যাহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।
পৃথক বিবৃতিতে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, বরং আইনের শাসন, সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার নেই।
আসকের মতে, পুলিশের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তাঁদের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা। আইন প্রয়োগের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনার কথা বলা দায়িত্বশীল আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এ ধরনের বক্তব্য পুলিশের পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
সংস্থাটি সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের অবিলম্বে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে। একই সঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো ধরনের অনুমোদন বা প্রশ্রয় দেওয়া হবে না—সরকারকে এমন দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছে।
আইজিপির বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটি সরকারের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে। তাদের প্রশ্ন, সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে, নাকি এটি আইজিপির ব্যক্তিগত বক্তব্য—তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত রাখার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার প্রত্যাশা করেছে এইচআরএসএস।