শুক্রবার, 23 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

বিশ্বজুড়ে ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে। বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের এই বিশাল পরিমাণ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের চিত্র তুলে ধরছে। ঋণের বোঝা শুধু সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকেই সীমিত করছে না, বরং সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া এবং জনসেবামূলক খাতে অর্থের সংকটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বজুড়ে ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে। বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের এই বিশাল পরিমাণ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের চিত্র তুলে ধরছে। ঋণের বোঝা শুধু সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকেই সীমিত করছে না, বরং সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া এবং জনসেবামূলক খাতে অর্থের সংকটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলছে।

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের মোট জিডিপির পরিমাণ ১১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। ২০২৬ সালের জুন শেষে বৈশ্বিক ঋণ ও জিডিপির অনুপাত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১০ শতাংশে। অর্থাৎ, এক বছরে বিশ্বে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যের প্রায় ৩ দশমিক ১ গুণ ঋণের বোঝা রয়েছে।

এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, বাড়ির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের কোনো কোনো বিক্ষোভ সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নিলেও অনেক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। শিক্ষা খাতের সমস্যা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার মধ্যেই এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

ইউরোপের দেশগুলোর আর্থিক সংকটও এসব বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। বছরের পর বছর ঋণ নেওয়ার কারণে অনেক দেশকে এখন বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে এবং স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করার জন্য অর্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

বন্ড বিক্রি করে ঋণ সংগ্রহ করে সরকার

সরকার সাধারণত ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে সরকারি বন্ড বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ড কিনলে সরকার তাঁদের সুদ দেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে বিনিয়োগকারী তাঁর মূল অর্থ ফেরত পান। বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার নির্দেশ করে, সরকারকে অর্থ ধার দেওয়ার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা কী পরিমাণ মুনাফা পাচ্ছেন। একই সঙ্গে এটি একটি দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে বাজারের আস্থা পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিয়ে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড কিনলে সুদের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হলে তিনি বছরে ২ দশমিক ৫০ ইউরো করে মোট ২৫ ইউরো সুদ পাবেন। অন্যদিকে, সুদের হার ৫ শতাংশ হলে বছরে ৫ ইউরো করে ১০ বছরে মোট ৫০ ইউরো সুদ পাবেন। উভয় ক্ষেত্রেই মেয়াদ শেষে মূল ১০০ ইউরো ফেরত দেওয়া হবে।

সরকারি বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড বেড়ে যায়। ফলে নতুন করে ঋণ নিতে সরকারকে বেশি সুদ দিতে হয়। বাড়ির ঋণের সুদ বাড়লে যেমন পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যায়, তেমনি সরকারি ঋণের সুদ বাড়লেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে ব্যয় করার সক্ষমতা কমে আসে।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণের সুদ প্রায় ৫ শতাংশ

ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার ২০০০-এর দশকের শুরুর পর থেকে ৫ শতাংশের কাছাকাছি ওঠেনি। ইউরো চালুর পরপরই ইউরোপের অর্থনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের আওতায় যেতে হয়েছিল।

বর্তমানে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশ। বিপরীতে, জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। দুই দেশের সুদের হারের ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা জার্মানির তুলনায় বেশি মুনাফা দাবি করছেন।

ইউরোজোনের দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণের সুদের হার তুলনা করলেও ফ্রান্সের অবস্থান উদ্বেগজনক। বর্তমানে ইতালি ও গ্রিসের তুলনায় ফ্রান্সকে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। অথচ ইউরোজোনের ঋণসংকটে এই দুটি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আলোচনায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্যের ঋণের সুদের হার ফ্রান্সের চেয়ে বেশি। যুক্তরাজ্য ইউরোজোনের সদস্য নয়।

সরকারি ঋণে বিশ্বে পঞ্চম ফ্রান্স

সরকারি ঋণের মোট পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১২৭ শতাংশ। জিডিপি হলো একটি দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য।

বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করে। বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা দেশটির সরকারি ঋণের প্রতিও চাহিদা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে এই সুবিধার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা সীমাহীন।

যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সর্বোচ্চ, ১৯৯ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। অন্যদিকে, ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ ঋণ নিয়ে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সরকারি ঋণগ্রস্ত দেশ ফ্রান্স। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিমাণ ইতালির ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। তবে অর্থনীতির আকারের তুলনায় ইতালির ঋণের বোঝা বেশি; দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে, জার্মানির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৬৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ছয় মাসে বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার

সরকারি ঋণের পাশাপাশি পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। আইআইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। বৈশ্বিক ঋণের এই বৃদ্ধিতে উদীয়মান বাজারের দেশগুলোর বড় অবদান রয়েছে।

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার

উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। এই ব্যয় বিশ্বের সামরিক খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে সামরিক খাতে ব্যয় ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে বার্ষিক ব্যয় এসব গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক খাতের প্রতিটির ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে।

ঋণের সুদ বাড়লে চাপে পড়েন সাধারণ মানুষ

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে জনসেবামূলক খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়াতে অথবা সরকারি ব্যয় কমাতে হতে পারে। এর ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, পেনশনসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক পরিষেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ ছাড়া সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে বাড়ি ও গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে। এতে পরিবার ও ব্যক্তিপর্যায়ে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যায়।

ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও আবাসনসংকটের মতো তাৎক্ষণিক কারণ থাকলেও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে সরকারগুলোকে ঋণের আর্থিক চাপ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পেনশন ও অন্যান্য জনসেবায় অর্থের চাহিদাও পূরণ করতে হচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ইউরোপের বহু সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।