বুধবার, 21 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

নির্বাচনের আগেই চাপে ফ্রান্সের মধ্যপন্থি রাজনীতি

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তরুণদের ক্ষোভ ও মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতি অনাস্থা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

নির্বাচনের আগেই চাপে ফ্রান্সের মধ্যপন্থি রাজনীতি

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তরুণদের ক্ষোভ ও মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতি অনাস্থা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর রোববার রাতে দেওয়া ভাষণে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কথা স্বীকার করেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তবে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা না করায় আন্দোলনকারীদের অনেকেই তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি।

ম্যাক্রোঁ বলেন, যারা সম্পদ ধ্বংস করেছে, তাদের এর মূল্য দিতে হবে। লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর যারা প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

কিন্তু প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইভরি-সুর-সেন এলাকার ২০ বছর বয়সী তরুণ ইয়ানিস প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশা করেননি। তার মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই ম্যাক্রোঁ প্রচলিত ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত তারা আবারও রাজপথে নামবেন এবং ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন।

গত সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে সহিংস বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। এতে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ম্যাক্রোঁর প্রতিনিধিত্ব করা মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে।

২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে এই অস্থিরতা দেশটির রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজপথের ক্ষোভের সমাধান নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই রয়েছে—এমন দাবি তুলে ধরছে বিভিন্ন দল।

বামপন্থি জনতাবাদী নেতা জেন-লুক মেলেনশঁ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থি নেতা মেরিন লো পেন বিক্ষোভের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া বিশৃঙ্খলাকে সামনে এনে আইনশৃঙ্খলা ও কর্তৃত্বের সংকটের বিষয়টি তুলে ধরছেন। মধ্যপন্থি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু আবার অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে উগ্র বামপন্থিরা প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের অংশ হিসেবে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।

নির্বাচনের আগের জনমত জরিপগুলোতে কট্টর বাম ও কট্টর ডানপন্থিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশজুড়ে পরিবর্তনের দাবি উঠলেও সেই পরিবর্তনের ধরন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই। দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করায় আগামী নির্বাচনের পর ম্যাক্রোঁকে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে হবে। ফ্রান্সের সংবিধান অনুযায়ী, তিনি আর এই পদে প্রার্থী হতে পারবেন না।

ইউপিইসি-প্যারিস দ্বাদশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনআইনের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলিঘ নাবলির মতে, তরুণদের দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ প্রার্থীদের নেই। তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে এবং তরুণদের উদ্দেশে দেওয়া রাজনৈতিক বার্তায় বাস্তবসম্মত সমাধান থাকতে হবে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আন্দোলন শুরু হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন। পরে এই আন্দোলন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ।

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের ভোট দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং রাজনৈতিক প্রচারে পেনশনসহ বিভিন্ন বিষয় ও বয়স্ক ভোটারদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় তাদের দাবিগুলো সাধারণত রাজনৈতিক আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তবে এবারের বিক্ষোভ তরুণদের সমস্যাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

নাবলি বলেন, এই আন্দোলন না হলে আগের মতোই সবকিছু চলতে থাকত। নির্বাচনে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের তুলনায় তরুণদের অংশগ্রহণ কম হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তাদের প্রতি একধরনের উদাসীনতা ছিল।

মেলেনশঁর প্রতি তরুণদের সমর্থন বাড়ছে

জেন-লুক মেলেনশঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবো (এলএফআই) শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন দিয়েছে। এ কারণে দলটির সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন, তরুণদের ক্ষোভকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা।

তবে বিক্ষোভ শুরুর আগেই তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা ছিল। দলটির কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় আবেদনের জন্য ব্যবহৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পারকুরসুপ বাতিল করা। অনেকের অভিযোগ, এই প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে মেলেনশঁর প্রতি সমর্থন ৪৯ শতাংশ। ২০২২ সালের তুলনায় এই সমর্থন ১০ শতাংশ বেড়েছে।

তরুণ বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের কাছে মেলেনশঁকে সমর্থন করার অর্থ শুধু কট্টর ডানপন্থার বিরোধিতা নয়; বরং মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতিও নিজেদের হতাশা প্রকাশ করা।

সোমবার লুভর জাদুঘরে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লিডিয়া বলেন, কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি ও মধ্যপন্থিদের মোকাবিলা করতে তিনি ফ্রান্স আনবোকে ভোট দেবেন। তার মতে, মধ্যপন্থিরা ক্ষমতায় এলে মূলত ম্যাক্রোঁর নীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

তবে ফ্রান্স আনবো ক্ষমতায় এলেই দেশটির সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না লিডিয়া। একই সঙ্গে দলটিকে সমালোচকদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনেরও বিরোধিতা করেন তিনি। তার মতে, মধ্যপন্থি কিংবা সামান্য বামঘেঁষা অবস্থানকেও এখন চরমপন্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

লিডিয়া বলেন, সহমর্মিতা দেখানো এখন প্রায় ব্যতিক্রমী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি সহমর্মিতাকেও চরম বামপন্থি অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরব লো পেন

রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীত মেরুতে রয়েছেন মেরিন লো পেন ও তার দল ন্যাশনাল র্যালি। তারা চলমান বিক্ষোভকে আইনশৃঙ্খলার সংকট হিসেবে তুলে ধরছে। দলটির অভিযোগ, সরকার দেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা মেলেনশঁর বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে তারা।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লো পেনের প্রতি সমর্থন ৩২ শতাংশ। জরিপে তিনি এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের একজন। অন্যদিকে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে ন্যাশনাল র্যালির অবস্থান দ্বিতীয়, ফ্রান্স আনবোর পরেই।

রোববার রাতে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় লো পেন বলেন, আগের দিন মানুষ দেখেছে, কীভাবে দেশটির শহর, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত ও লুটপাটের শিকার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ফ্রান্স এখন আস্থা ও কর্তৃত্বের গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশটির গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। তার ভাষায়, দেশটি কার্যত সহিংসতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

সংকুচিত হচ্ছে ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক পরিসর

বাম ও ডানপন্থিদের এই অবস্থানের মাঝখানে ক্রমবর্ধমান চাপে রয়েছে ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শিবির। তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শুরু হয়েছিল ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এখন আরেক দফা বড় সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে তার শাসনামল শেষের দিকে এগোচ্ছে।

আগের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন শুরু হয়েছিল জ্বালানি কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। পরে তা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ম্যাক্রোঁ অভিজাত শ্রেণিকে বেশি সুবিধা দিচ্ছেন—এমন ধারণার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

তবে এবারের পরিস্থিতি আগের আন্দোলনের চেয়ে আলাদা। নতুন করে ক্ষমতায় আসা কোনো সরকারের পক্ষেই আর্থিক সহায়তা দিয়ে জনগণের অসন্তোষ প্রশমিত করার মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুযোগ থাকবে না।

গত বছর ফ্রান্সের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারি বাজেট ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বাজেট ঘাটতি ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে ম্যাক্রোঁর রেখে যাওয়া কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। জনগণের ক্ষোভ আরও না বাড়িয়ে কীভাবে সরকারি ব্যয় কমানো যায়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।

বর্তমান আন্দোলন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের বৃহত্তর হতাশার চিত্রও তুলে ধরেছে। ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তা কমে ১৫ শতাংশে নেমেছে, যা তার জন্য সর্বনিম্ন।

রোববার রাতের ভাষণে ম্যাক্রোঁ সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীর বিদ্রোহীদের দায়ী করেন, যাদের সঙ্গে বহু অপরাধী যোগ দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে সংক্ষেপে কথা বললেও নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপের ঘোষণা দেননি তিনি।

এর পরিবর্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুকে দিয়েছেন। একই সঙ্গে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।

চলমান অস্থিরতা ম্যাক্রোঁর বিরোধীদের জন্য তার শাসনামলের ব্যর্থতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের বৈষম্য মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

এখন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লড়াই এমন এক প্রজন্মের সমর্থন আদায়কে কেন্দ্র করে, যারা মনে করে রাষ্ট্র তাদের হতাশ করেছে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে আগামী কয়েক মাসে রাজনৈতিক বর্ণালির সব পক্ষই তরুণ ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করবে।