মঙ্গলবার, 20 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ১২: বাসচালক ঘুমিয়ে পড়াতেই দুর্ঘটনা, দাবি আহত যাত্রীর

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। বাসের এক আহত যাত্রীর দাবি, চালক ঘুমিয়ে পড়ায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। দুর্ঘটনার পর আহত যাত্রীদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও টাকা লুটের অভিযোগও উঠেছে।

ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ১২: বাসচালক ঘুমিয়ে পড়াতেই দুর্ঘটনা, দাবি আহত যাত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। বাসের এক আহত যাত্রীর দাবি, চালক ঘুমিয়ে পড়ায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। দুর্ঘটনার পর আহত যাত্রীদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও টাকা লুটের অভিযোগও উঠেছে।

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।

দুর্ঘটনায় আহত যাত্রী সোহেল রানা বলেন, ভোরের দিকে বাস চালানোর সময় চালক ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। একপর্যায়ে বাসটি সড়কের বাম দিক থেকে ডান দিকে চলে যায়। তখন বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

তিনি বলেন, “এরপর চেতনা ফিরলে দেখি কয়েকজন আমাদের মোবাইল, মানিব্যাগ পকেটের টাকা নিয়ে যাচ্ছে।”

সোহেল রানা আরও বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই কিছু মানুষ যাত্রীদের মালামাল নিয়ে যেতে শুরু করেন। বাসের ভেতরে আটকে থাকায় তারা প্রতিবাদ করতে পারছিলেন না। তবে কয়েকজন স্থানীয় মানুষ উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সহযোগিতা করেছেন।

নিহতদের পরিচয়

নিহত ১২ জনের মধ্যে বাবা ও মেয়েও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) এবং তাঁর মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮) রয়েছেন।

এ ছাড়া শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ট্রাকচালক আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার (৩৫) নিহত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় জানা গেছে, তাঁরা হলেন শরীয়তপুরের আলমগীর মাতবর (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুস সালাম (৩৫), শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী (২২), মাদারীপুরের নাইম তালুকদার (২০), নার্গিস আক্তার (৩৫), বরগুনার জেসমিন আক্তার (৩৫), নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চিরঞ্জিত কুমার (২৫), মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন (৩৭) ও শাহাজুল ইসলাম (৩৬) এবং লক্ষ্মীপুরের রাকিব হোসেন (২৫)। অন্য আহতদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানান, ভোরে নাটোর থেকে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী যাত্রীবাহী আরপি স্পেশাল বাসটির সংঘর্ষ হয়। আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে পাঠানো হয়।

আহতদের মধ্যে আরও কেউ মারা যেতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আক্তার হামিদ বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুর্ঘটনার পর মালামাল লুটের অভিযোগ

বাসের আহত যাত্রী রাকিব হোসেনসহ আরও কয়েকজন অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর তাঁদের জ্ঞান ফিরলে কয়েকজনকে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও টাকা নিয়ে যেতে দেখেন। বাসের মধ্যে আটকে থাকায় তাঁরা বাধা দিতে পারেননি। তবে কয়েকজন তাঁদের বাস থেকে বের হতে সহযোগিতা করেন।

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, কিছু মানুষ বিপদের সময়ও অন্যদের সহযোগিতা না করে উল্টো অসহযোগিতা করেন।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো আহত ও নিহতদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।


নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। সে সময় তিনি বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হওয়ার কথা জানান।

তবে মরদেহগুলো বনপাড়া হাইওয়ে থানায় নেওয়ার পর নিহতের সংখ্যা ১২ বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, “এটাই কনক্রিট তথ্য, ১২ জন মারা গেছেন, ১৪ জন নয়।”

জেলা প্রশাসকের দেওয়া ভুল তথ্যের বিষয়ে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, বনপাড়া হাইওয়ে থানা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তাড়াহুড়ো করে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। সে কারণে জেলা প্রশাসক ও তাঁরাও ভুল তথ্য পেয়েছিলেন।

তদন্ত কমিটি গঠন, নিহতদের পরিবারকে সহায়তা

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস।

এ সময় নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার জানান, নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর

নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়। স্বজনেরা থানায় এসে প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করার পর সেখানে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বলেন, ১২ জনের মরদেহ তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বজনেরা যেসব মালামাল শনাক্ত করেছেন, সেগুলোও তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।