যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ম্যারাথন ফিউশন পারদ থেকে স্বর্ণ তৈরির দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রন ব্যবহার করে পারদকে স্বর্ণে রূপান্তর করা সম্ভব। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে স্বর্ণ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এর ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গত ২১ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজেদের এ সাফল্যের কথা জানায় ম্যারাথন ফিউশন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের পরীক্ষায় পারদ থেকে স্বর্ণ তৈরির হার ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা সার্নের আগের রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি।
তবে পরীক্ষায় ঠিক কী পরিমাণ স্বর্ণ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ তথ্য-উপাত্তও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পারদ থেকে স্বর্ণ তৈরির এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন। এতে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তর করা হয়।
ম্যারাথন ফিউশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের মধ্যে ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রন ব্যবহার করে পারদের নির্দিষ্ট আইসোটোপে পরিবর্তন আনা হবে। পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে সেটি স্থিতিশীল স্বর্ণ-১৯৭-এ পরিণত হবে।
তবে এ প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় উপজাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব উপাদান দূর করতে উৎপাদিত স্বর্ণ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হতে পারে।
পরীক্ষাগারে স্বর্ণ তৈরির ধারণা অবশ্য নতুন নয়। ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সিসার নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষ ঘটিয়ে স্বর্ণের নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয়েছিল।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ওই পরীক্ষায় প্রায় ৮৬ বিলিয়ন স্বর্ণের নিউক্লিয়াস তৈরি হয়েছিল। তবে সবগুলো মিলিয়ে সেগুলোর ভর ছিল মাত্র ২৯ পিকোগ্রাম। এ ছাড়া উৎপন্ন স্বর্ণের নিউক্লিয়াসগুলো অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে যায়। ফলে ওই পরীক্ষা থেকে ব্যবহারযোগ্য স্বর্ণ পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এবার ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রন কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক বড় পরিসরে স্বর্ণ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে ম্যারাথন ফিউশন।
প্রতিষ্ঠানটির একটি গবেষণাপত্রে বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রতি গিগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতার স্থাপনা থেকে বছরে প্রায় দুই টন স্বর্ণ উৎপাদনের সম্ভাবনার হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে এ পরিমাণ স্বর্ণ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা এখনো বাস্তবে নির্মিত হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা রিঅ্যাক্টরের ফিউশন ক্ষমতা মাত্র এক কিলোওয়াট। অন্যদিকে, বছরে দুই টন স্বর্ণ উৎপাদনের হিসাব করা হয়েছে এক গিগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতার স্থাপনা ধরে। অর্থাৎ, বর্তমান রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ও প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
এ ছাড়া তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের উপস্থিতির কারণে উৎপাদিত স্বর্ণ বিক্রির উপযোগী করতে আনুমানিক সাত থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিটি বাস্তবে বাণিজ্যিকভাবে কতটা কার্যকর হবে এবং স্বর্ণের বাজারে এর কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ওপর।