তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নির্ধারণে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন কমিটির নবম বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া বৈঠকটি বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চলে। এতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সেটি নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হয়ে বহাল থাকলে, উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, তা নিয়ে মতামত এসেছে।
এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টি করে ওই পদধারীকে উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন একজন। বিকল্প হিসেবে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত করার এবং তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। একইভাবে দুই পক্ষের সম্মতিতে স্পিকার ছাড়া অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগের বিধান রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন কেউ কেউ।
কমিটির সভাপতি বলেন, বৈঠকে আসা সব প্রস্তাব কমিটির আলোচনায় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরির সময় তুলে ধরা হবে। সেগুলোর ভিত্তিতে আরও প্রস্তাব আসতে পারে। পরে সেসব বিবেচনায় সংবিধান সংশোধন বিল তৈরি করা হতে পারে।
বৈঠকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত বিষয় এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা, বিচারক নিয়োগের আইন প্রণয়ন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়েও মতামত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে আগের সরকারের জারি করা অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা হয়নি, কারণ তাতে বেশ কিছু ভুলত্রুটি ছিল বলে তাঁরা মনে করেন।
সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সীমাবদ্ধতা শিথিল করার প্রস্তাব এসেছে। সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, আস্থা ও অনাস্থা ভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির বাইরে অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়া ও ভিন্নমত নথিভুক্ত করার অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন, কাজের পরিধি এবং স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, অন্তত ছয়টি প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।
সংবিধানে সর্বজনগ্রাহ্য সংশোধনীর খসড়া তৈরি, সামগ্রিক সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কমিটি বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিচ্ছে। এর আগে রাজনৈতিক দল ও জোট, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, নারী নেতৃত্ব এবং গণঅভ্যুত্থানের অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিটি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরুতে জটিলতার মুখে পড়ে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ীরা দুই পদেই শপথ নেন।
গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে। তবে কমিটিতে বিরোধী দলগুলো কোনো প্রতিনিধি দেয়নি।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন সংকলনের কাজ শুরু হবে। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা এবং তাদের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।