উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি শুরুর ৩৪তম দিনে এসে শ্রেণিকক্ষে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আরও দীর্ঘায়িত হওয়া ঠেকাতে একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শিক্ষকরা। তবে নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যের সঙ্গে অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছেন, ক্লাসে ফিরলেও আগের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চলবে।
২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চুয়েটে দুর্গাপূজার ছুটি ছিল। রোববার থেকে কর্মদিবস শুরু হলেও চলমান আন্দোলনের কারণে সেদিনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে রোববার দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দেন। এতে তাঁরা লেখেন, “আমরা আর আমাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না। আমরা ক্লাসে ফিরতে চাই, একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে চাই।”
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দ্রুত ক্লাসে ফেরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
খোলা চিঠির বিষয়ে আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় তাঁদের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর জন্য শিক্ষকদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। তবে প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনও চলবে।
চিঠিতে শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, ক্লাসে ফিরতে চাওয়ার অর্থ আন্দোলন থেকে সরে আসা নয়। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত এই আন্দোলনের এক দফা দাবি হলো অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে চুয়েট আবারও কঠোর আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠবে বলেও চিঠিতে সতর্ক করেন শিক্ষার্থীরা। যৌক্তিক দাবি আদায়ে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন বলে জানান।
শিক্ষার্থীদের এই চিঠির পর রোববার দুপুরে সাধারণ সভায় বসে শিক্ষক সমিতি। সভায় দাবি আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত রেখে একাডেমিক কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অসহযোগ বজায় রেখেই শিক্ষকরা একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন। তবে নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক যেকোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কঠোরভাবে পালন করা হবে।
পরে চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথ সভা শেষে এক বিবৃতিতে একই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
এর আগে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় সঞ্চালনা করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আবুল হাছান। সভাপতিত্ব করেন সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ। সভার বিষয়ে শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, সাধারণ সভায় একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গণমাধ্যমকে জানানো হবে। পরে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত সভার কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশ করা হয়।
নিয়োগের ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর প্রতিবাদে এবং আগের উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি ঘোষণা করে চুয়েট শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনগুলো।
আন্দোলনের মধ্যেই ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনে উপাচার্য পদে যোগ দেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। পরে ১২ অক্টোবর সকালে প্রথমবারের মতো নিজ কার্যালয়ে যান তিনি। সেদিন দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনে তালা দিলে তিনি সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের সহায়তায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন তিনি।
১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে অনলাইনে চুয়েটের সিন্ডিকেট সভা করেন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। ১৫ জন সিন্ডিকেট সদস্যের মধ্যে সভায় উপস্থিত ছিলেন ছয়জন। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্বশীল মনোভাব নিয়ে অবিলম্বে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে ফেরার আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ও পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। অচলাবস্থা নিরসন এবং দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্তও নেয় সিন্ডিকেট।
চুয়েটের চলমান অচলাবস্থা নিরসনে ১৮ অক্টোবর ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে ওই কমিটিতে চুয়েটের কোনো শিক্ষক বা প্রতিনিধি রাখা হয়নি। কমিটিটি বুধবার সকালে চুয়েট পরিদর্শন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে।