যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ডিজেলের মজুত ছাড়ার পথে ইউরোপ
ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো নিজেদের মজুত থেকে ডিজেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। শুক্রবার ফ্রান্সের দেওয়া একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা হয়।
বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত তিনটি সূত্রের বরাতে শুক্রবার (২ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে ফ্রান্সের প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউরোপের দেশগুলো ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সদস্য দেশগুলো আরও ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়বে।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত জ্বালানি মজুত থেকে তেল ছাড়ার যে দাবি জানিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপ ২০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে নিজেদের মজুতের একটি অংশ বাজারে ছাড়তে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে দেশটি থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। এ কারণে ইউরোপের ওপর চাপ আরও বাড়ছে বলে শুক্রবারের আলোচনায় উঠে আসে।
তবে মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ইইউকে দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি, অন্যদিকে সংকট মোকাবিলার জন্য জরুরি মজুত ধরে রাখাও প্রয়োজন। কারণ ইরানের যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটি আরও তীব্র হতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শুক্রবার প্যারিস সময় বেলা আড়াইটায় জি-৭ নেতাদের সঙ্গে ভিডিও বৈঠকে বসবেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের দপ্তর এলিসি প্যালেস জানিয়েছে, ওই বৈঠকে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ম্যাক্রোঁ। শুক্রবার এলিসি প্যালেস জানায়, ওই আলোচনায় জ্বালানির বাড়তি দাম মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের যৌথভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন ম্যাক্রোঁ। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তিন ব্যক্তির বরাতে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন জার্মানি ও ফ্রান্সকে তাদের জরুরি ডিজেল মজুত কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। তা না হলে দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানির ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
শুক্রবার দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের বড় দেশগুলোর কাছ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল মজুত বাজারে ছাড়ার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মজুত বাড়ানোর লক্ষ্যে চীনের তেল শোধনাগারগুলোও অক্টোবর মাসে জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাব অনুযায়ী ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়া হলে তা ইইউর ডিজেল ও গ্যাসঅয়েলের মোট জরুরি মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশের সমান হবে। একই পরিমাণ ডিজেল ইউরোপীয় জোটটির এক বছরে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের প্রায় ৩ শতাংশের সমান।
ইউরোপ নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আগে মূলত রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে ডিজেল আমদানি করত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল আমদানির ওপর ইউরোপের নির্ভরতা বেড়েছে।
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ইউরোপ নিজেদের ডিজেলের চাহিদার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব থেকে পূরণ করেছে। ইইউর ২৭টি দেশ ও যুক্তরাজ্যের আমদানির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ইউরোপে ডিজেল সরবরাহের পরিমাণ ছিল—
যুক্তরাষ্ট্র:
২০২৫ সালে— প্রতিদিন ২ লাখ ২৪ হাজার ব্যারেল।
২০২৬ সালে— প্রতিদিন ৩ লাখ ২ হাজার ব্যারেল।
সৌদি আরব:
২০২৫ সালে— প্রতিদিন ২ লাখ ৩৭ হাজার ব্যারেল।
২০২৬ সালে— প্রতিদিন ২ লাখ ১১ হাজার ব্যারেল।
ভারত:
২০২৫ সালে— প্রতিদিন ১ লাখ ৩৭ হাজার ব্যারেল।
২০২৬ সালে— প্রতিদিন ৩৭ হাজার ব্যারেল।
কুয়েত:
২০২৫ সালে— প্রতিদিন ৭৪ হাজার ব্যারেল।
২০২৬ সালে— প্রতিদিন ৪৫ হাজার ব্যারেল।
নোট: ২০২৫ সালের হিসাব ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের। সূত্র: কেপলার।
শুক্রবারের বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো আরও আলোচনা করেছে, ডিজেলের মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হলে এর একটি শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বৈঠকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
ওই সূত্র আরও জানায়, শুক্রবার বিকেলে জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসতে পারেন। বর্তমানে জি-৭-এর সভাপতিত্ব করছে ফ্রান্স।
ইরানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় গত মার্চে ৩২ সদস্যের আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সমন্বিতভাবে তাদের কৌশলগত তেল মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সংস্থাটির ইতিহাসে এটিই এ ধরনের সবচেয়ে বড় মজুত ছাড়ার সিদ্ধান্ত।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল চলতি সপ্তাহে জানিয়েছেন, সদস্য দেশগুলো এরই মধ্যে ওই ৪০ কোটি ব্যারেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাজারে ছেড়ে দিয়েছে।