রবিবার, 1 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ না হলে প্রধানমন্ত্রীকে ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি নাহিদের

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। দুই মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ না হলে প্রধানমন্ত্রীকে ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি নাহিদের
ছবি: সংগৃহীত

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। দুই মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা, লুটপাট, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই দুজন মন্ত্রীই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে দেশের সর্বত্র আমরা মিছিল করব। সেই মিছিল নিয়ে আমরা জনাব তারেক রহমানকে (প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান) ঘেরাও করে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ।’

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ছিনতাই ও রাহাজানিতে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগ না দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, চলমান নৈরাজ্য, গুম ও খুনের দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। একই সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রীরও পদত্যাগ দাবি করেন তিনি।

‘নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি’

বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর দাবি, দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েই তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কীভাবে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব কায়েম করা হবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। আমরা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। কিন্তু জনগণের সামনে আমাদের প্রতিশ্রুতি, পতিত স্বৈরাচার এবং এই নব্য স্বৈরাচার–এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশা আল্লাহ।’

আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। নাহিদ বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে শুনছি পতিত স্বৈরাচার নাকি আসবে দেশে! আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না।...তাই বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

করিডর ও গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সরকারের সমালোচনা

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, সীমান্তে হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ভারতীয় চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে বর্তমান সরকার সক্ষম নয়।

জাপান সফরে গিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে করিডর দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ধরনের কোনো করিডর দেশের জনগণ মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন এনসিপির আহ্বায়ক।

গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরে চুক্তিটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে নতুন করে সম্পাদন করা না হলে জনগণ আবারও আন্দোলনে নামবে। নাহিদ বলেন, ‘এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না’।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। নাহিদ ইসলামের দাবি, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা-৮ আসনে পরাজিত করা হয়েছিল। এবার তাঁকে হারতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদকে নির্বাচনের বাইরে রাখার মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এসব অপচেষ্টার জবাব দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ।

জ্বালানির দাম নিয়ে প্রশ্ন আখতার হোসেনের

সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এলপিজির দাম এক হাজার টাকা হলেও বাংলাদেশে একই গ্যাস কিনতে হচ্ছে আড়াই হাজার টাকায়। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কলকাতায় কি ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না? এ প্রশ্নের জবাব জ্বালানিমন্ত্রীকে দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আখতার হোসেন সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান। পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার। এতে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আকরাম হুসাইন, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।

শাহবাগে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর সমাগম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এনসিপির মাঠপর্যায়ের বড় কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল শুক্রবারের এই গণবিক্ষোভ সমাবেশ। এতে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী অংশ নেন। সমাবেশের আগে সপ্তাহজুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

বেলা তিনটায় সমাবেশ শুরুর কথা থাকলেও এর আগে থেকেই বাংলামোটরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং শাহবাগ এলাকায় নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের অনেকে বাসে করে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে শুরু করেন। পরে বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা যোগ দেন। বিকেল পৌনে চারটার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং সোয়া চারটার দিকে আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার বড় দুটি মিছিল সমাবেশে প্রবেশ করে।

বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি।